সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৩৬ অপরাহ্ন

Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Search in posts
Search in pages
Filter by Categories
24 hour essay writing service
Uncategorized
অপরাধ
অর্থনীতি
আদালত
আন্তর্জাতিক
আবহাওয়া
ইসলাম
কলাম
ক্যাম্পাস
ক্রিকেট
খেলাধুলা
চাকুরির খবর
ছবি
জাতীয়
জীবন ব্যবস্থা
তথ্যপ্রযুক্তি
ধর্ম
নির্বাচিত খবর
পরামর্শ
পুঁজিবাজার
প্রবাস
ফিচার
ফুটবল
ফেসবুক কর্নার
বিনোদন
বিবিধ
ভিডিও
ভোটের হাওয়া
মতামত
রাজধানী
রাজনীতি
রিপোর্টার পরিচিতি
শিক্ষা
শিরোনাম
শিল্প ও সাহিত্য
শীর্ষ খবর
সকল বিভাগ
সবখবর
সম্পাদকীয়
সর্বশেষ
সংস্কৃতি
সাক্ষাৎকার
সারাদেশ
সিটি কর্পোরেশন
স্বাস্থ্য কথা
শিরোনাম

প্রবীণরা বোঝা নন মূল্যবান সম্পদ

প্রবীণরা বোঝা নন মূল্যবান সম্পদ
প্রিন্ট করুন
চারপাশে অনেক প্রবীণ ব্যক্তিকে দেখেছি এবং দেখছি, প্রতিনিয়ত যারা পরিবার আর সমাজে নিগৃহীত হচ্ছেন। অবহেলা আর অনাদরে জীবনের বাকি সময়গুলো পার করছেন। পরিবারে, সমাজে তারা কতটা অবহেলিত ও অপাঙ্ক্তেয়- ১৬ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘আমার ঠিকানা এখন বৃদ্ধাশ্রম’ শিরোনামে প্রকাশিত এক কলামে একজন সাবেক কূটনীতিক তা তুলে ধরেছেন। লেখাটি পড়ে আমার মনে হয়েছে তিনি বিবেকের তাড়নায় একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

ওই জবানবন্দিতে তিনি লিখেছেন, তার বাবা ১৯৯২ সালে ৯২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে দেখেছেন তার বাবা অনাদর আর অবহেলায় জীবনের শেষ দিনগুলো কীভাবে কাটিয়েছেন। তিনি তার বাবা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আর্থিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অনেক আশা নিয়ে তার পাঁচ ছেলে ও চার মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। মানুষটি তার সর্বস্ব দিয়ে আমাদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছিলেন। আমরা সবাই জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত; কিন্তু কেউই মানুষ হতে পারিনি। অপরিণামদর্শী আমার ‘নির্বোধ’ আব্বা তার শেষ সম্বল ধানমণ্ডির এক বিঘা জমি- যার বর্তমান বাজারমূল্য নিদেনপক্ষে ১০০ কোটি টাকা; তিনি ছেলেমেয়েদের অকাতরে দান করে গিয়েছিলেন। জীবন সায়াহ্নে এমন পরিণতি হবে ভাবতেও পারেননি। তার শেষ সম্বলটুকু হাতছাড়া না হলে হয়তো আমরা ভাইবোনরা তার সেবাযত্ন করার জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতাম।”

তিনি আরও লিখেছেন, তার বাবা মৃত্যুর একদিন আগে তাকে কাছে নিয়ে বলেছেন, ‘আমি দরিদ্র কৃষকের সন্তান। আমার বাবা আমাকে কোনো সম্পত্তি দিয়ে যাননি। দেয়ার সঙ্গতিও ছিল না। আমি যখন চাকরি থেকে অবসর নিই তখন তোমরা সবাই লেখাপড়া করছ। যেখানে প্রতিদিনের ভাত-কাপড় জোগাড় করতে পারি না, সেখানে জমি কিনে বাড়ি করা ছিল অলীক স্বপ্ন। হঠাৎই ধানমণ্ডির এক বিঘা জমি আমার নামে বরাদ্দ হল। তোমার মা এবাড়ি-ওবাড়ি থেকে ঋণ করে ৫০০০ টাকা জোগাড় করেন। এ জমি তোমাদের দিয়ে যাচ্ছি। আর জমি কেনার লোভ করো না। জনবহুল দেশে আমাদের জায়গার বড় অভাব। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি কিনলে অন্যকে তুমি বঞ্চিত করবে। তাছাড়া কতটা জমি মানুষের প্রয়োজন? জীবনে তো প্রয়োজন কেবল একখণ্ড ছয় ফুট দীর্ঘ ও তিন ফুট প্রস্থ জমি।’

ভদ্রলোক একটি চমৎকার এবং অসাধারণ কথা বলে গেছেন। একজন মানুষের জীবনে কত প্রয়োজন? আমাদের জীবনের সময়টাতো খুব বেশি দীর্ঘ নয়। এ ছোট্ট এক জীবনে এত চাহিদা কেন? ভদ্রভাবে বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমাদের চাহিদা সীমাহীন। চাহিদার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা আমাদের দায়িত্ব, কর্তব্য যথাযথ পালন করতে পারি না। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দিকেও যথাযথভাবে নজর দিতে পারি না। অবহেলা আর অনাদরে বৃদ্ধ বয়সে তারা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে সীমাহীন যন্ত্রণা আর কষ্ট নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান; যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও কষ্টের। সাবেক এ কূটনীতিক তার জীবনের অধিকাংশ সময় দেশের বাইরে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা নিয়ে সুখ-স্বাচ্ছেন্দ্যে কাটিয়েছেন। নিঃসঙ্গ, একাকিত্ব জীবনের বোঝা বয়ে বেড়ানো বাবার খবর নেয়ার সময় তার হয়নি। হয়তো তার প্রতিষ্ঠিত এবং বিত্তশালী অন্যান্য ভাইবোন বাবার দেখাশোনা করছেন ভেবে তিনি এদিকে তেমন নজর দেননি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জীবনসায়াহ্নে এসে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন তার বাবার অনাদর আর অবহেলার কথা।

শুধু তিনি নন। এই তো কয়েকদিন আগে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের প্রবীণ নিবাসে থাকার জন্য এক সাবেক সচিবের স্ত্রী আসেন, যিনি তার স্বামীর অবর্তমানে ছেলের সংসারে ছেলের বউয়ের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন, সেসব বর্ণনা শুনেছি। ছেলের বউ রুটি বানানো বেলুন দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেছে। মাথা ফেটে যাওয়াতে হাসপাতালে নিলে ডাক্তারের প্রশ্নের জবাবে তিনি লজ্জায় সত্যি কথাটা বলতে পারেননি। বলেছেন বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গেছে। তিনি ছেলে আর ছেলের বউকে মানুষের কাছে ছোট করতে চাননি, কারণ তিনি একজন স্নেহময়ী মা। সেই মা দীর্ঘদিন অনেক অত্যাচার-অনাচার সহ্য করতে না পেরে প্রবীণ নিবাসে এসেছেন একটুখানি আশ্রয়ের জন্য।

আরও একজন প্রবীণা লুৎফুননেছা হারুন- যিনি পাকিস্তান আমলে প্রথম মহিলা পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। তিনিও স্বামীর অবর্তমানে একমাত্র ছেলেকে বিয়ে দিয়েছিলেন অনেক আশা নিয়ে; কিন্তু ছেলের বৌয়ের অনাদর আর অপমান সহ্য করতে না পেরে সব ছেড়ে একসময় নিবাসে চলে আসেন। এরকম বহু ঘটনা প্রায় প্রতিদিন দেখছি এবং শুনছি। প্রবীণরা আসলেই ভালো অবস্থানে নেই। আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ প্রবীণ-প্রবীণাই কর্মহীন, পরমুখাপেক্ষী; পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত।

প্রবীণদের পরিবার ও সমাজে বোঝা মনে করা হয়। যেসব পরিবারে আয়-রোজগার কম, অভাব নিত্যসঙ্গী, মানবিক মূল্যবোধ কম, সেসব পরিবারে প্রবীণদের অবস্থা আরও করুণ। যেখানে তথাকথিত শিক্ষিত, বিত্তশালী পরিবারেই প্রবীণ-প্রবীণারা ভালো অবস্থানে নেই, সেখানে নিম্নবিত্ত বা নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অধিকাংশ পরিবারে ছেলে বা ছেলের বউয়ের দয়া এবং করুণায় তাদের বেঁচে থাকতে হয়। অনেক পরিবারে সন্তানরা বৃদ্ধ বাবা-মাকে অপাঙ্ক্তেয় ভেবে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। পরিবারে ও সমাজে তাদের কথা, পরামর্শ কিংবা মতামতের কোনো গুরুত্ব দেয়া হয় না। অথচ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে এক সময় প্রতিটি মানুষকে বার্ধক্যের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, এ কথা কেউ মনে রাখে না। আজ যারা প্রবীণদের অবহেলা-অনাদর করছেন তারাও এক সময় প্রবীণ হয়ে যাবেন। প্রকৃতির এ অমোঘ বাস্তবতাকে কেউ স্বীকার করতে চায় না।

অথচ এ বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আমরা যদি বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করি, ভালোবাসি তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা দেখে শিক্ষা গ্রহণ করবে; পরিবার ও সমাজে প্রবীণরা স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস ও চলাফেরা করতে পারবেন। বর্তমান সরকার প্রবীণদের জন্য মাসিক ৫০০ টাকা প্রবীণ ভাতা বরাদ্দ করেছেন যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। প্রবীণদের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার জন্য ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ‘প্রবীণ নীড়’ প্রতিষ্ঠাসহ প্রবীণদের জন্য প্রবীণ মন্ত্রণালয়, প্রবীণ কল্যাণ ব্যাংক স্থাপন করা প্রয়োজন।

সরকারি পর্যায়ে সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রবীণদের জন্য কোটা ব্যবস্থা রেখে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষম প্রবীণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, কারণ আমাদের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়াতে অনেকেই কর্মক্ষম রয়েছেন যারা এখনও দেশ ও সমাজের জন্য অবদান রাখতে পারেন। গণপরিবহনে প্রবীণদের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে প্রবীণ আসন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। গণসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবীণবান্ধব করতে হবে।

‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পিতা-মাতার ভরণপোষণে ব্যর্থতার জন্য সন্তানের সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে। অনাদায়ে তিন মাস কারাভোগেরও ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এ আইন সম্পর্কে অনেকে জানে না। আর জানে না বলেই প্রয়োগও হচ্ছে কম। এছাড়া এ আইনে প্রবীণদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক প্রবীণকেই অবহেলা-অসম্মান আর অনাদরে জীবনের শেষ সময়টা কাটাতে হয়। এর থেকে দ্রুত পরিত্রাণের জন্য সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রবীণদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। প্রবীণদের যথাযোগ্য সম্মান, মর্যাদা ও সেবাপ্রদানের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবারে সন্তানদের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ কথা সবাইকে মনে রাখতে হবে, প্রবীণরা পরিবার বা সমাজে বোঝা নন বরং তারা মূল্যবান সম্পদ।

মনজু আরা বেগম : গবেষক ও আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সংশ্লিষ্ট সংবাদ