নিজস্ব প্রতিবেদক :

বন্যায় মানুষের ভোগান্তি লাঘবে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ বুধবার (২২ জুন) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে অনেক দিন পর সরাসরি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। তবে আজ আমার হৃদয় খানিকটা ভারাক্রান্ত। আপনারা জানেন, বর্তমানে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুই জেলা সিলেট ও সুনামগঞ্জ। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জও বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, জামালপুর, শেরপুর জেলাসহ ১১টি জেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, বর্ষাকাল শুরু হয়েছে। এ সময় বন্যা হবে এটাই স্বাভাবিক। স্বাভাবিক বন্যা আমাদের কাঙ্ক্ষিত। বন্যার পানি আমাদের কৃষি জমিকে উর্বর এবং সতেজ করে। ময়লা-আবর্জনা-জঞ্জাল ধুয়ে মুছে সাফ করে নিয়ে যায়। এ ধরনের বন্যার সঙ্গে বসবাস করতে আমাদের দেশের মানুষ অভ্যস্থ। স্বাভাবিক মাত্রার বন্যা মোকাবিলা করার সক্ষমতাও আমাদের সরকারের রয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, কিন্তু গত সপ্তাহে সিলেটে যে বন্যা হয়েছে তা অকল্পনীয়। এটাকে প্রলয়ঙ্করী বললেও ঠিক বোঝানো যায় না। সিলেট বিভাগের উজানে ভারতের মেঘালয় এবং আসামে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে তিন দিনে ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত শুক্রবার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৯৭২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ১২২ বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ।

সরকারপ্রধান বলেন, মেঘালয় ও আসাম পাহাড়ি এলাকা। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত ভাটির দিকে সমতল ভূমি সুনামগঞ্জ-সিলেটে প্রবেশ করে প্লাবিত করেছে। এ অঞ্চলের হাওর এবং নদীগুলোর স্বাভাবিক বন্যার পানি ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ পানি ধারণ এবং পরিবহনের ক্ষমতা এসব হাওর বা নদীগুলোর নেই। ফলে পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে গ্রাম, শহর, নগর, সড়ক-মহাসড়ক প্লাবিত করেছে। এবারের বন্যা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতম। বিগত একশ-সোয়াশ বছরের মধ্যে এত প্রলয়ঙ্কারী বন্যা হয়নি।

তিনি বলেন, বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, সরকারেরও নেই। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। কোনো সরকার সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে কি না সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা জানেন বন্যার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি উদ্ধার এবং ত্রাণ কাজ পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছি। কোনো সময়ক্ষেপণ না করে সিভিল প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং কোস্টগার্ড, পুলিশ বাহিনীকে নিয়োজিত করেছি। তিনি বলেন, বিভিন্ন বাহিনীর শতাধিক বোট, হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য যানবাহন উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ৫০০ জন সদস্য ৭টি হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমানসহ সিলেট এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা ও ত্রাণ বিতরণের জন্য সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাবেসক লীগ, কৃষকলীগের নেতাকর্মীদের দুর্গত মানুষদের সহায়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কাজ চালাচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি গতকাল নিজে সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোণা জেলার বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সিলেট অঞ্চলে ১ হাজার ২৮৫টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ৩০০ মেডিকেল টিম কাজ করছে। গতকাল পর্যন্ত বন্যাকবলিত ১১টি জেলায় ৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৩৫ লাখ নগদ টাকা এবং ৫৫ হাজার শুকনা এবং অন্যান্য খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো শুকনো খাবার এবং বিশুদ্ধ পানির। আমরা তার ব্যবস্থাই করছি। আমাদের দলের নেতাকর্মীরাও সাধ্যমতো দুর্গত মানুষের ঘরে শুকনো এবং রান্না করার খাবার পৌঁছে দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় পানি কমতে শুরু করেছে। আশা করা হচ্ছে দু’একদিনের মধ্যে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে। বন্যার পানি নেমে গেলে বাড়িঘর মেরামত এবং কৃষি পুনর্বাসনের কর্মসূচি হাতে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের নির্দিষ্ট করে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি বন্যাকবলিত এলাকার জনসাধারণকে আশ্বাস দিতে চাই, সরকার আপনাদের পাশে আছে। মানুষের ভোগান্তি লাঘবে আমরা সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x