ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের জের ধরে ভিসা ও মাস্টারকার্ড রাশিয়ায় তাদের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর আগে পেপাল, নেটফ্লিক্স, ইন্টেলের মতো সংস্থাগুলোও রাশিয়ায় তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য বিকল্প চিন্তা করছে রাশিয়া। তারা চীনের ইউনিয়ন পে ব্যবহার করে কার্ড ইস্যু করার পরিকল্পনা করছে। এর ফলে রাশিয়ান কার্ড হোল্ডারদের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক প্রভাব কমে আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে এই বিকল্প খুব একটা সহজ হবে না। কারণ রাশিয়ার মধ্যে ইউনিয়ন পে’র নেটওয়ার্ক ছোট। রাশিয়ার অনেক ব্যাংকের সঙ্গে এই কোম্পানির কোনো সম্পর্ক নেই। পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান অলিভার ওয়াইম্যান এর জেসন একবার্গের মতে, রাশিয়ানদের জন্য সমস্যা হলো বিশ্বের ১৮০টিরও বেশি দেশে থাকা সত্ত্বেও ইউনিয়ন পে আমেরিকা এবং ইউরোপে এখনো একটি প্রান্তিক পরিষেবা।

ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিবেচনায় ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞরা এখন ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমের (সিআইপিএস) প্রশংসা করছেন, যার ওপর ভিত্তি করে চীনা ব্যাংকগুলো বিশ্বজুড়ে তাদের নিজস্ব মুদ্রা (ইউয়ান) লেনদেন করে থাকে। এবং এটি নিয়ে চীনের জাতীয়তাবাদী ব্লগারদের একটি নতুন স্বপ্ন রয়েছে।

এদিকে, কেউ কেউ বেলজিয়ামভিত্তিক আর্থিক লেনদেন পরিষেবা সুইফটের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এ নিয়ে টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্ম ওয়েইবোর একজন জনপ্রিয় ব্লগার লিখেছেন, সুইফট নামক জিনিসটির ওপর নির্ভর করা যায় না।

সিআইপিএস ও সুইফট-এর কোনোটিই চীনে ততটা পরিচিত নয়। কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে দেশটি চীনের নিজস্ব আর্থিক নেটওয়ার্কগুলোর ওপর জোর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে রাশিয়াকে সাহায্য করার জন্য চীনের তিনটি প্রাথমিক আর্থিক চ্যানেল রয়েছে যার মধ্যে দুটি বৈধ। তবে এগুলোর কোনোটিই পশ্চিমা আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার বিকল্প ব্যবস্থা হওয়ার মতো নয়।

সিআইপিএস এক্ষেত্রে কোনো অলৌকিক সমাধান হবে না, যা চাইনিজ ব্লগাররা আশা করছেন। হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির এডউইন লাই এর মতে, বিনিয়োগের স্বার্থে বিদেশি ব্যাংকগুলোকে চীনা ব্যাংকের মাধ্যমে সুইফট ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে সিআইপিএসর সঙ্গে সংযুক্ত করা উচিত। তাহলে রাশিয়ান ও বিদেশি ব্যাংক যাদের ওপর সুইফট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তাদের মধ্যে লেনদেন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

প্রথমত, দুই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক লেনদেনের জন্য সুইফটের প্রয়োজন হয় না। এদিকে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাশিয়ার প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইউয়ান আমানত রয়েছে। এর সঙ্গে ১৫০ বিলিয়ন ইউয়ানের একটি বিনিময়-লাইন চুক্তিও রয়েছে।

বিনিয়োগ ব্যাংক নাটিক্সিসের বিশ্লেষকরা মনে করেন, ডলারের মাধ্যমে অন্য বাণিজ্য-অর্থায়ন রুটগুলো বন্ধ থাকায় রাশিয়া চীন থেকে আমদানির ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করতে পারে। তবে এই বাণিজ্য মূলত চীনের নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানভিত্তিক, যা রাশিয়ার বাণিজ্যকে সীমিত করবে।

এদিকে, চীনের নীতি নির্ধারকরা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চাচ্ছেন। প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ান প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে যারা চীনের সঙ্গে কাজ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা যদিও এখনো আরোপ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এ পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যারা স্থানীয় আইন অনুযায়ী রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে। বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে রাশিয়াকে যদি ইউয়ানে লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে তার জন্য সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের দরকার হবে এবং চীনা কর্মকর্তারা মস্কোতে তাদের মিত্রদের জন্য এর চেয়েও বেশি কিছু করতে চান।

চীন কয়েক দশক ধরে বেশ কয়েকটি জটিল এবং বিস্তৃত আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর নেটওয়ার্ক যেগুলো সারা বিশ্বের বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নিয়েছে। যদিও চীনা ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রকরা গত ২ মার্চ ঘোষণা দেন যে, তারা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মানবে না, তবে এর বেশিরভাগ ব্যাংগুলোই পশ্চিমা নীতি মেনে চলে, বিশেষ করে যারা পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার সঙ্গে নিয়মিত লেনদেন করে থাকে।

এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর যেগুলো দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য অর্থায়নের সিংহভাগ পরিচালনা করে, রাশিয়ার সঙ্গে ডলারকেন্দ্রিক বাণিজ্য চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি কম। আর্থিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের নিল শিয়ারিংয়ের মতে, বৈশ্বিক অর্থবাজারে সম্পূর্ণ আধিপত্য বজায় রাখা রাশিয়ার যেকোনো প্রস্তাবনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এর ফলে আর্থিক সহায়তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত রুট তৈরি হবে যা নিষেধাজ্ঞাকে এড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের আক্রোশের শিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য অর্থায়নকারী ছোট ব্যাংকগুলোর প্রতি চীনা উপেক্ষার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই ক্রিয়াকলাপগুলো সাধারণত ছোট পরিসরে ঘটে এবং অনেকে এই আইনে ধরা পড়ে এবং নিজেরাই নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়।

২০১২ সালে একটি ইরানী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য ব্যাংক অব কুনলুনকে আমেরিকার আক্রমণের শিকার হতে হয়েছিল। এক্ষেত্রে কিছু ছোট চীনা ব্যাংক রাশিয়ার সঙ্গে ঝুঁকি নিতে পারে, তবে তারা রাশিয়ার প্রত্যাশিত বড় আকারের সহায়তা দিতে অক্ষম হবে।

সবাই বলেছে, চীন-রাশিয়ার আর্থিক সম্পর্ক রাশিয়ার প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী আর্থিক নেটওয়ার্ক তৈরিতে চীনের চেষ্টার ত্রুটিগুলো নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে এবং এক্ষেত্রে সিআইপিএসের জন্য অনেক সমস্যা পরিষ্কারভাবেই ধরা পড়েছে। পুঁজি প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য, শুধু ব্রিটিশ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ছাড়া চীন মূল ভূখণ্ডের বাইরের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সিস্টেমটিকে সরাসরি যুক্ত করেনি।

সিআইপিএস’র দেশীয় বার্তাপ্রেরণ সিস্টেম শুধু চীনা ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করে। একে উন্নত করতে চীনকে অবশ্যই বিদেশি ব্যাংকগুলোকে সরাসরি সংযুক্ত করতে হবে। এ ধরনের সংযোগের অভাব লেনদেনের পরিমাণে প্রতিফলিত হয়। এটি প্রতিদিন মাত্র ১৩ হাজার লেনদেন প্রসেস করে, যা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ-পেমেন্ট সিস্টেম ‘চিপস’ দ্বারা পরিচালিত সংখ্যার মাত্র ২০ ভাগের এক ভাগ।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পুতিনকে ‘সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ইউক্রেন রাশিয়ার সংঘাত চীনের কিছু আর্থিক দুর্বলতা প্রকাশ করছে, যা তাদের সম্পর্ককে দুর্বল করে তুলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x