ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: নারায়ণগঞ্জে বৈধ প্রার্থী ৪০, বাতিল ১৬, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় ঐক্যজোটের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল
নারায়ণগঞ্জ জেলা রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী এবং অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে মোট ৮৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছেন। যাচাই‑বাছাই শেষে ৫৭ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। পরে জেলা নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে মনোনয়নপত্র যাচাই‑বাছাই করে ৪০টি বৈধ ও ১৬টি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ঋণ খেলাপি, অসম্পূর্ণ হলফনামা, এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংযোজনের ঘাটতি এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস বা হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া। প্রাথমিকভাবে কিছু প্রার্থী স্থগিত হলেও পরবর্তীতে সংশোধনের মাধ্যমে বৈধতা পেয়েছেন।
নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা শেষ ২৯ ডিসেম্বর, বাছাই ৩০ ডিসেম্বর–৪ জানুয়ারি, আপিল দায়ের ১১ জানুয়ারি, আপিল নিষ্পত্তি ১২–১৮ জানুয়ারি, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ২০ জানুয়ারি, প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি, নির্বাচনী প্রচার ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি, এবং ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ)
মোট ৫ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বৈধ প্রার্থী: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মোঃ আনোয়ার হোসেন মোল্লা, বিএনপি মনোনীত মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মোঃ রেহান আফজাল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোঃ ইমদাদুল্লাহ। বাতিল প্রার্থী: মোঃ দুলাল, মোঃ মনিরুজ্জামান চন্দন। রূপগঞ্জে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি—উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী দাবি করছে। স্থানীয় নিরপেক্ষ ভোটার ও পর্যবেক্ষকদের মতে, সুষ্ঠুভাবে ভোট হলে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার)
মোট ১০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বৈধ প্রার্থী: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মোঃ ইলিয়াস মোল্লা, বিএনপি মনোনীত নজরুল ইসলাম আজাদ এবং আরও কয়েকজন । বাতিল প্রার্থী: আবু হানিফ হৃদয়, আব্দুল আউয়াল, মোঃ মিনহাজুর রহমান, মাওলানা মোঃ হাবিবুল্লাহ। প্রাথমিকভাবে স্থগিত ছিলেন ইলিয়াস মোল্লা, হাফিজুর রহমান, আতাউর রহমান আঙ্গুর। জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১২ দলীয় ঐক্যজোট সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক ইলিয়াস মোল্লা সুবিধা জনক অবস্থায় রয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সিদ্ধিরগঞ্জ-সোনারগাঁ)
মোট ১১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বৈধ প্রার্থী: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, বিএনপি মনোনীত আজহারুল ইসলাম মান্নান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গোলাম মসীহ, গণঅধিকার পরিষদের মোঃ ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোঃ মেহেদী হাসান এবং অন্যান্যরা। বাতিল প্রার্থী: অধ্যাপক রেজাউল করিম। সোনারগাঁ আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ডঃ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া সাংগঠনিক ও জোটগত সমর্থনে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা)
মোট ১৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বৈধ প্রার্থী: ১২ দলীয় ঐক্যজোটের এনসিপি মনোনীত প্রার্থী এডভোকেট আল আমিন, বিএনপির প্রার্থী জমিয়তে ইসলামের মাওলানা মনির কাসেমী, এবং অন্যান্যরা। বাতিল প্রার্থী: আরিফ ভূঁইয়া, সালাউদ্দিন খোকা, ফাতিমা মনির, মোঃ ইকবাল হোসেন, মোহাম্মদ সেলিম আহমেদ। ফতুল্লা আসনে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি প্রার্থী না দিলেও দলটির মহানগর ও স্থানীয় সংগঠনসমূহ ১২ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী এডভোকেট আল আমিনের পক্ষে সর্বাত্মকভাবে মাঠে কাজ করছে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর)
মোট ১২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। বৈধ প্রার্থী: ১২ দলীয় ঐক্যজোটের অংশীদার ইসলামী খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী এ বি এম সিরাজুল মনির, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম এবং অন্যান্যরা। বাতিল প্রার্থী: মোঃ মাকসুদ, মোঃ সাখাওয়াত হোসেন, আবু জাফর আহমদ, মোহাম্মদ নাহিদ। সদর-বন্দর আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে জোট প্রার্থী এ বি এম সিরাজুল মনিরকে সমর্থন দিয়েছেন।
রাজনৈতিক মাঠের চিত্র ও পর্যবেক্ষণ:
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে এবারের নির্বাচন বহু-পক্ষীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নিচ্ছে। মনোনয়ন যাচাই‑বাছাই পর্বে প্রার্থীদের কাগজপত্রে দেখা ত্রুটি ও প্রাথমিক স্থগিতকরণ পরবর্তীতে সংশোধনের মাধ্যমে বৈধতা পাওয়াকে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর প্রক্রিয়ার উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া চলায় এ পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
একাধিক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি থাকায় চূড়ান্ত ভোটের হিসাব কিছুটা জটিল হতে পারে। জামায়াতে ইসলামী দুটি আসনে সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে ১২ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থীদের প্রকাশ্য সমর্থন প্রদান করায় জোটভিত্তিক রাজনীতির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় শ্রমজীবী ও নগর ভোটারদের ভূমিকা নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে ফতুল্লা ও সদর-বন্দর এলাকায়।
তবে লক্ষ্যণীয় যে আপিল দায়ের, আপিল নিষ্পত্তি, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, প্রতীক বরাদ্দ এবং নির্বাচনী প্রচারের শুরু—এই সকল ধাপ এখনও চলমান। তাই এই মুহূর্তে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকাকে সম্পূর্ণ চূড়ান্ত বলে ধরা যাবে না। ভবিষ্যতে এগুলোতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থেকে যায়, যা নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।





















