ঢাকা , রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যার দায় স্বীকার করে অটোরিকশা চালকের জবানবন্দি

সাংবাদিক

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. সুমন মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শনিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে তিনি জবানবন্দি দেন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

শনিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লার আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান।

এর আগে শনিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, গত বুধবার রাতে নগরীর পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাজমিনকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় তোলেন সুমন। পরে তিনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি কৃষিজমিতে নিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন। এরপর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থলে অটোরিকশা ফেলে পালিয়ে যান তিনি।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার নিবন্ধন নম্বরের সূত্র ধরে সুমনকে শনাক্ত করা হয়। শুক্রবার চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি ও লালমাই থানা-পুলিশের যৌথ দল। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য সুমনের অটোরিকশা ভাড়া করেন তাজমিন। ভাড়া ঠিক হয় ৩০০ টাকা। পথে তাজমিন চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সুমন শহরের দিকে না গিয়ে শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন পথে ঘুরিয়ে লালমাই উপজেলার জগৎপুর এলাকার নির্জন স্থানে নিয়ে যান তাকে। জায়গাটি অপরিচিত মনে হওয়ায় তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় সুমন তাকে আটকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে তিনি বাধা দেন। দুজনের ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানক্ষেতে কাত হয়ে পড়ে যায়।

পুলিশের ভাষ্য, তাজমিন নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করলে সুমন তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ধানক্ষেতে কাদামাটির মধ্যে পা দিয়ে তার মাথা চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর তাজমিনের ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি ফেলে যান সুমন। পরে স্থানীয় কাচিকাঁটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় যান। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি।

পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তাজমিন। এ সময় মায়ের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে কথা বলে তিনি বান্ধবীর বাসায় আছেন বলে জানান।

তবে তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্ট ও অবস্থান পর্যালোচনা করে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে পারেন, ৪ অক্টোবর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। পরদিন ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারে যান। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নুরজাহান হোটেলের সামনে নামেন।

পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে কক্সবাজার থেকে আসা গাড়ি থেকে তাজমিনকে একা নামতে দেখা যায়। আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সর্বশেষ পদুয়ার বাজারের নুরজাহান হোটেলের সামনে দেখা যায়। এরপর তিনি সড়কের দিকে চলে যান। পরবর্তী গন্তব্যের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলিমের ভাষ্য, গভীর রাতে তার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে উদ্ধারের অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাজমিন। তবে তিনি ঘুমিয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বার্তাটি দেখতে পারেননি। পরদিন সকালে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন স্বজনেরা। পরে তারা মরদেহটি তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন।

নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলিমের মেয়ে। তার বাবা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় থাকতেন তাজমিন। তিনি নগরের ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ১০:৫৮:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
৫০৮ Time View

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যার দায় স্বীকার করে অটোরিকশা চালকের জবানবন্দি

আপডেটের সময় : ১০:৫৮:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. সুমন মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। শনিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে তিনি জবানবন্দি দেন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

শনিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লার আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান।

এর আগে শনিবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, গত বুধবার রাতে নগরীর পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে ৩০০ টাকা ভাড়ায় তাজমিনকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অটোরিকশায় তোলেন সুমন। পরে তিনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি কৃষিজমিতে নিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন। এরপর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থলে অটোরিকশা ফেলে পালিয়ে যান তিনি।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার নিবন্ধন নম্বরের সূত্র ধরে সুমনকে শনাক্ত করা হয়। শুক্রবার চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি ও লালমাই থানা-পুলিশের যৌথ দল। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য সুমনের অটোরিকশা ভাড়া করেন তাজমিন। ভাড়া ঠিক হয় ৩০০ টাকা। পথে তাজমিন চালককে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সুমন শহরের দিকে না গিয়ে শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন পথে ঘুরিয়ে লালমাই উপজেলার জগৎপুর এলাকার নির্জন স্থানে নিয়ে যান তাকে। জায়গাটি অপরিচিত মনে হওয়ায় তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় সুমন তাকে আটকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে তিনি বাধা দেন। দুজনের ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানক্ষেতে কাত হয়ে পড়ে যায়।

পুলিশের ভাষ্য, তাজমিন নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করলে সুমন তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ধানক্ষেতে কাদামাটির মধ্যে পা দিয়ে তার মাথা চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর তাজমিনের ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি ফেলে যান সুমন। পরে স্থানীয় কাচিকাঁটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে অন্য একটি অটোরিকশায় বাখরাবাদ এলাকায় যান। সেখানে একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গলে ফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে চলে যান তিনি।

পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তাজমিন। এ সময় মায়ের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে কথা বলে তিনি বান্ধবীর বাসায় আছেন বলে জানান।

তবে তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্ট ও অবস্থান পর্যালোচনা করে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে পারেন, ৪ অক্টোবর তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। পরদিন ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারে যান। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নুরজাহান হোটেলের সামনে নামেন।

পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে কক্সবাজার থেকে আসা গাড়ি থেকে তাজমিনকে একা নামতে দেখা যায়। আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়। বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সর্বশেষ পদুয়ার বাজারের নুরজাহান হোটেলের সামনে দেখা যায়। এরপর তিনি সড়কের দিকে চলে যান। পরবর্তী গন্তব্যের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলিমের ভাষ্য, গভীর রাতে তার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে উদ্ধারের অনুরোধ জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাজমিন। তবে তিনি ঘুমিয়ে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বার্তাটি দেখতে পারেননি। পরদিন সকালে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন স্বজনেরা। পরে তারা মরদেহটি তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন।

নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলিমের মেয়ে। তার বাবা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় থাকতেন তাজমিন। তিনি নগরের ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন।