30 November, 2020
শিরোনাম

মুজিববর্ষের বিশেষ সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির পূর্ণাঙ্গ ভাষণ

 09 Nov, 2020   51 বার দেখা হয়েছে

 নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রিন্ট

বিস্‌মিল্লাহির-রহ্‌মানির রহিম।

জনাব স্পিকার,

আসসালামু আলাইকুম।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর জন্মশতবার্ষিকী 'মুজিববর্ষ-২০২০' উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। এটি আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। এ উপলক্ষে আমি আপনার মাধ্যমে মাননীয় সংসদ নেতা ও সংসদ-সদস্যসহ প্রিয় দেশবাসী ও দেশের বাইরে বসবাসরত সকল প্রবাসীকে মুজিববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

২. ভাষণের শুরুতেই আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অমর শহিদকে, যাঁদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি একটি সার্বভৌম দেশ ও স্বাধীন জাতিসত্তা, পবিত্র সংবিধান ও লাল-সবুজ পতাকা।

আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিনআহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে- যাঁরা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

৩. আমি আরও স্মরণ করছি তাঁদেরকে, যাঁরা এ দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের মর্যাদা সমুন্নত রাখার লড়াইয়ে আত্মত্যাগ করেছেন। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের তিন মহান পুরুষ-শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে- যাঁদের অবদান আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

৪. আমি পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেসব বিদেশি বন্ধুদের যাঁরা আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। আমি পরম শ্রদ্ধায় আরও স্মরণ করছি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডে শহিদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর সুযোগ্য সহধর্মিনী মহিয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ সকল শহিদকে। আমি তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

৫.

জনাব স্পিকার,

কোভিড-১৯ এর থাবায় গোটা বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা বারো লাখ ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যাও প্রায় ৫ কোটি। এখনও মৃত্যু ও আক্রান্তের মিছিলে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে শত শত মানুষের নাম। বাংলাদেশেও করোনায় কেড়ে নিয়েছে ৬ হাজারের অধিক অমূল্য প্রাণ। আমি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্মরণ করছি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে, যিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অপরিসীম অবদান রেখেছেন এবং আমৃত্যু বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে ভূমিকা পালন করেছেন।

করোনাকালে আমরা আরো হারিয়েছি সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ও বেগম সাহারা খাতুন, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যসহ অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে। এছাড়া হারিয়েছি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত, লেফটেনেন্ট কর্ণেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী, বিশিষ্ট আইনজীবী ও এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং প্রখ্যাত আইনজীবী ও সাবেক এটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের অনেক ব্যক্তিত্বকে। আমি তাঁদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি।

৬.

জনাব স্পিকার,

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরজন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে 'মুজিববর্ষ' পালনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একইসঙ্গে 'মুজিববর্ষ' উপলক্ষে বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের জন্য মাননীয় স্পীকার আপনাকে এবং আপনার মাধ্যমে জাতীয় সংসদের সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমি আশা করি অধিবেশনের কার্যক্রম বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এছাড়া জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অধিবেশনে জাতির পিতাকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে আমরা নিজেরাও সম্মানিত হবো। সীমিত সময় ও পরিসরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাঁর জীবন ও কর্মের বিস্তৃতি এতটাই বিশাল যে ঘন্টার পর ঘন্টা এমনকি দিনের পর দিন আলোচনা করলেও তা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

৭.

জনাব স্পিকার,

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু বলতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে ইতিহাস, ইতিহাসের পরম্পরা। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার নিভৃত পল্লী টুংগীপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা কেটেছে গ্রামের কাদা-জল, মেঠো পথ আর প্রকৃতির খোলামেলা পরিবেশে। পরোপকার আর অন্যের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সবসময় তিনি নিজেকে জড়িয়ে নিতেন। নিজের সুখ-দুঃখের কথা না ভেবে অন্যকে নিয়ে ভাবতেন। সেই থেকে শুরু। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে যেখানেই অন্যায়-অবিচার, শোষণ- নির্যাতন দেখেছেন, সেখানেই প্রতিবাদে নেমে পড়েছেন। কখনো নিজের এবং পরিবারের গণ্ডির মধ্যে বাধা পড়েননি।

ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও গেয়েছেন বাংলা, বাঙালি আর বাংলাদেশের জয়গান। ফাঁসির সেলের পাশেই কবর খোঁড়া হচ্ছে জেনেও বাঙালির স্বাধীনতার লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল ও অনড়। আজীবন বাংলা ও বাঙালিকে ভালোবেসে গেছেন, স্থান করে নিয়েছেন মানুষের মনের মনিকোঠায়।

৮. ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ শৈশব থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মানবদরদী কিন্তু অধিকার আদায়ে আপসহীন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ব্রিটিশ বিরোধী সভা-সমাবেশে অংশ নেন তিনি। গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার খরচ চালাতে গড়ে তোলেন 'মুসলিম সেবা সমিতি'। ১৯৩৮ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে বঙ্গবন্ধুর পরিচয় ঘটে এবং প্রথম পরিচয়েই তিনি নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। সোহরাওয়ার্দীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমেই রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি। তারপর থেকে লেখাপড়া, রাজনীতি ও জনসেবা যুগপৎভাবে চলতে থাকে। ১৯৪৬ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ঢাকা আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি থেকে পূর্ববাংলার রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। দেশ বিভাগের কিছুদিন পরই তরুণ নেতা শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন, ব্রিটিশ পরাধীনতার কবল থেকে মুক্তি পেলেও বাঙালি নতুন করে পশ্চিমাদের শোষণের কবলে পড়েছে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী প্রথম আঘাত হানে বাঙালির মায়ের ভাষা 'বাংলা'র উপর। ঘোষণা দেয় ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা'। বাংলা ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালনকালে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ শেখ মুজিব সচিবালয় গেট থেকে গ্রেফতার হন। অর্থাৎ, পাকিস্তান কায়েম হওয়ার ৮ মাসের মধ্যেই তিনি কারাবরণ করেন।

৯. ১৯৪৯ সালে ১৭ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সহযোগিতা ও সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। মুচলেকা দিয়ে অনেকে ছাত্রত্ব ফিরে পেলেও তিনি সেপথে পা বাড়াননি, তিনি ছিলেন আপসহীন। যেখানেই অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নির্যাতন দেখেছেন সেখানেই তিনি প্রতিবাদে নেমে পড়েছেন। জীবনে কখনো নীতি-আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি। ভাষার দাবিতে সারাদেশে আন্দোলন ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে আটকাবস্থায় হাসপাতালে থেকেই অন্যান্য ছাত্রনেতাদের সাথে গোপনে বৈঠক করে একুশে ফেব্রুয়ারি 'রাষ্ট্রভাষা দিবস' পালন এবং সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন।

১০.

জনাব স্পিকার,

আন্দোলন-সংগ্রাম ও কারাভোগের মধ্য দিয়েই শেখ মুজিব বাঙালির অধিকার আদায়ের পথে এগিয়ে চলেন। ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই তিনি ৩৩ বছর বয়সে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিলে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হিসাবে গোপালগঞ্জ থেকে প্রথমবারের মতো আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালে ১৫ই মে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সমবায়, ঋণ ও গ্রামীণ পুনর্গঠন বিষয়ক মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার ভেঙ্গে দেয় এবং অন্যান্য রাজনীতিবিদদের সাথে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন।

১১. ১৯৫৫ সালের ৫ই জুন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী মুসলিম লীগের হয়ে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পাকিস্তান গণপরিষদে ভাষণদানকালে 'পূর্ব পাকিস্তান' নামের বিরোধিতা করে 'পূর্ববাংলা' করার আহ্বান জানান। একই ভাষণে আঞ্চলিক ও স্বায়ত্তশাসনেরও দাবি জানান। ১৯৫৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জোট সরকারের শিল্প-বাণিজ্য-শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন এবং ১৯৫৭ সালের ৩রা এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৭ সালের ৩০ মে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার স্বার্থে জোট সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। দলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর কতটা আনুগত্য, আন্তরিকতা ও টান ছিল মন্ত্রিপরিষদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ক্ষমতা বা কোন কিছু চাওয়া-পাওয়া বঙ্গবন্ধুকে তাঁর লক্ষ্য ও আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত করতে পারেনি- এটাও তার একটি বড় প্রমাণ।

১২.

জনাব স্পিকার,

১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু দুই বছর কারাভোগ করেন এবং ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে আবারো গ্রেফতার হন। কিন্তু কোনো কিছুই শেখ মুজিবকে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু লাহোরে ঐতিহাসিক ৬-দফা উত্থাপনের পর প্রথম তিন মাসেই পাকিস্তানের সামরিক সরকার তাঁকে আটবার গ্রেফতার করে। জেল থেকে বের হয়েই বঙ্গবন্ধু ৬-দফার সমর্থনে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়ান। জেলজুলুম কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। যদিও সামরিক সরকার ৬-দফা নিয়ে জনমত গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে অধিকাংশ সময় বঙ্গবন্ধুকে কারান্তরীণ রাখে। বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে প্রতিহত করতে সামরিক সরকার কারান্তরীণ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে ৩৫ জন বাঙালির বিরুদ্ধে 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য' শীর্ষক মামলা দায়ের করে যা 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' নামে পরিচিত। সামরিক সরকারের এহেন অগণতান্ত্রিক, নিপীড়ন ও নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার জনগণ রুখে দাঁড়ায়। আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। দেশব্যাপী সৃষ্টি হয় গণঅভ্যুত্থান। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সামরিক শাসক ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি 'আগরতলা ষড়যন্ত্র' মামলায় আটক শেখ মুজিবসহ অন্যান্য বন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লাখো ছাত্র-জনতার সংবর্ধনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি দেওয়া হয়। এই সমাবেশেই তিনি ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১-দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।

১৩.

জনাব স্পিকার,

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যক্তি ও পারিবারিক বন্ধন কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সবসময়ই বঙ্গবন্ধুকে তাঁর চলার পথে সাহস জুগিয়েছেন, বিপদে ভরসা দিয়েছেন। নিজের ও পরিবারের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে বড় করে দেখেছেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবদান বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্মরণ সভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন 'জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আমাদের আবাসভূমির নাম পূর্ব পাকিস্তান নয়, হবে বাংলাদেশ'।

১৪. ইতোমধ্যে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১-দফার আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সমগ্র পূর্ব বাংলা। পাকিস্তান সামরিক শাসক বাধ্য হয় সাধারণ নির্বাচন দিতে। অবশেষে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। সৌভাগ্যক্রমে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আমি নিজেও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হই।

১৫.

জনাব স্পিকার,

৭০-এর বিজয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা টালবাহানার আশ্রয় নিতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকেও পহেলা মার্চ এক ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত করেন।

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। আন্দোলনে যোগ হয় নতুন মাত্রা। জনগণ তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার দিক-নির্দেশনার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' যা ছিল মূলত স্বাধীনতারই ডাক।

১৬.

জনাব স্পিকার,

সম্প্রতি মন্ত্রিসভা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের দিনকে 'ঐতিহাসিক দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একটি ভাষণ কিভাবে গোটা জাতিকে জাগিয়ে তোলে, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তার অনন্য উদাহরণ। এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতার ডাকই দেননি বরং মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা ও ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। এ ভাষণ শুধু বাঙালি জাতির জন্যই নয় বরং সারাবিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত-মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস। ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে World Documentary Heritage-এর মর্যাদা দিয়ে Memory of the World International Register-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। এজন্য বাঙালি হিসাবে গর্বে আমাদের বুক ভরে ওঠে। এ ভাষণের কারণে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক ম্যাগাজিন ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল সংখ্যায় বঙ্গবন্ধুকে 'Poet of Politics' হিসাবে অভিহিত করে। এই ভাষণের পর বাংলার ঘরে ঘরে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। অঘোষিতভাবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পূর্ববাংলার অফিস আদালতসহ সবকিছু চলতে থাকে। ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে উৎফুল্ল জনতার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেন।

১৭. ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করে। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ওই দিনই বঙ্গবন্ধুকে হানাদার বাহিনী গ্রেফতার করে। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষক-শ্রমিক ছাত্র-জনতা যার যা কিছু ছিল তা নিয়েই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। তারপরের ইতিহাস সবারই জানা।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এবং ৩০ লাখ শহিদের রক্ত, দু'লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়, সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন 'স্বাধীনতা'।

১৮.

জনাব স্পিকার,

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তা যেন অপূর্ণই থেকে যায়। সাত কোটি বাঙালি তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার আসারঅপেক্ষায় ক্ষণ গুণতে থাকেন। অবশেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন পৌঁছান। সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার এডওয়ার্ড হিথ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু লন্ডনে একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন। দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। এসময় তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে বঙ্গবন্ধু বিশাল এক জনসভায় বাংলায় বক্তৃতা করেন। শুরু হলো সদ্য স্বাধীন দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথ চলা।

১৯. বঙ্গবন্ধু দেশের মাটিতে পা রেখেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের কাজে নেমে পড়েন। তিনি কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, পর্যটন, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগসহ খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ভূমি সংস্কার, সেচযন্ত্র স্থাপন এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ করেন।

ইসলামিক ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন, টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জায়গা বরাদ্দ, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন এবং পঙ্গু হাসপাতাল স্থাপনে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে জাতি আজও পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বঙ্গবন্ধু সংবিধানে নারী-পুরুষের সম-অধিকার এবং রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সম-অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতেও উদ্যোগী হন। বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও কূটনৈতিক দক্ষতায় বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদান করে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনসহ ভারত-প্রত্যাগত শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং গরীব দুঃখী মানুষের কল্যাণেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শোষিত ও নিপীড়িত জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তথা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ব শান্তি পরিষদ তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান 'জুলিও কুরি' পুরস্কারে ভূষিত করে।

২০.

জনাব স্পিকার,

বঙ্গবন্ধু আমৃত্যু আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি গণতন্ত্রের উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। তাই ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার সাথে সাথে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলেছেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তৎকালীন শাসকচক্রের চক্রান্তের জন্য সংসদে বসার সুযোগ হয়নি।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই পুনর্গঠন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে সংসদকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ২২ নম্বর আদেশবলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে গণপরিষদ গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম 'গণপরিষদ' অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা এই পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।

প্রথম দিনের অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি হিসাবে বর্ষীয়ান নেতা মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ-এর নাম প্রস্তাব করেন। তাঁর সভাপতিত্বে গণপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন এবং স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করেন। শাহ আবদুল হামিদ স্পিকার এবং জনাব মোহাম্মদউল্লাহ ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। গণপরিষদের প্রধান দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা।

২১.

জনাব স্পিকার,

কনিষ্ঠ ও নবীন সদস্য হিসাবে গণপরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ ছিল আমার জন্য খুবই আগ্রহ ও আকর্ষণের। নিতান্ত নবীন সদস্য হিসাবে বয়ঃজ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ সদস্যদের কর্মকাণ্ড খুবই আগ্রহভরে প্রত্যক্ষ করতাম। পার্লামেন্টারিয়ান বঙ্গবন্ধু তখন ছিলেন আমার আগ্রহের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে।

২২. বঙ্গবন্ধু গণপরিষদের কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। গণপরিষদে কোন বিরোধী দল ছিলো না। বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র সব মিলিয়ে সদস্যসংখ্যা ১০-এ উন্নীত হয়নি। কিন্তু বিরোধী সদস্যগণ প্রতিবাদমুখর ছিলেন, দীর্ঘক্ষণ বক্তব্য রাখার সুযোগ পেতেন। সংসদ অধিবেশন হতো প্রাণবন্ত। যুক্তিতর্ক ও মতামত উপস্থাপন ছিল খুবই আকর্ষণীয়। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল সংসদে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও তাঁর ভাষণ। আমার স্পষ্ট মনে আছে ন্যাপ থেকে নির্বাচিত তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথা। পার্লামেন্টে বক্তৃতা করার সুযোগ চাইলে সবসময়ই তিনি সুযোগ পেতেন। স্পীকার মাঝে মাঝে তাঁকে মাইক দিতে না চাইলেও বঙ্গবন্ধু বলতেন 'ওকে সুযোগ দেন, বিরোধী পক্ষের কথা আগে শুনতে হবে'।

সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিটি গঠন প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'শুধু যে আমাদের দলীয় সদস্য থেকে কমিটি করব তা নয়, দল-মত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, জনগণকে যাতে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী একটা সুষ্ঠু সংবিধান দেওয়া যায়, এই উদ্দেশ্যে সকলের মতামত চাইব, এই সংবিধানে মানবিক অধিকার থাকবে, যে অধিকার মানুষ চিরজীবন ভোগ করতে পারবে।'

২৩.

জনাব স্পিকার,

বঙ্গবন্ধু সংসদ কার্যক্রমের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলার ব্যাপারেও ছিলেন খুবই সচেতন। এ প্রসঙ্গে প্রথম অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসেই তিনি বলেছিলেন 'আমি মাননীয় সংসদ-সদস্যদের আর একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই যে, কোন প্রস্তাব আনার আগে পার্টিতে তা আলোচনা করে তারপর উপস্থাপন করবেন। তা না হলে এর দ্বারা পার্টির শৃঙ্খলা নষ্ট হবে।'

২৪. বঙ্গবন্ধু সংসদে হাস্যরস করতেও পিছপা হতেন না। একবার সংসদে বক্তব্য দানকালে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, 'মাননীয় স্পিকার, আপনার মাধ্যমে অনুরোধ জানাচ্ছি যে, ভবিষ্যতে আমার এই মাইকটি একটু উঁচু করে দিবেন, আমি মানুষ একটু বেশি লম্বা।' হাউজ পরিচালনার ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন খুবই আন্তরিক। কার্যপ্রণালী বিধি মেনে নিজেও আলোচনা করতেন এবং অন্য সদস্যরাও যাতে তা মেনে চলে সে ব্যাপারেও শক্ত হাতে হাউজ চালানোর ব্যাপারে স্পিকারকে অনুরোধ জানাতেন।

২৫.

জনাব স্পিকার,

বঙ্গবন্ধু সংসদের সকল কার্যক্রমে বিরোধী সদস্যদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। Rules of Procedure-এর খসড়ার ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,'আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টিই একেবারে সবকিছু চূড়ান্ত করে নাই - দুই-একজন যাঁরা নির্দলীয় বা বিরোধী পার্টি যাই বলুন আমার কোনো আপত্তি নাই, যদি আপনাদের ভালো কোনো সংশোধনী থাকে, তা নিশ্চয়ই দেশের মঙ্গলের জন্য মনকে আমরা বড় করে তা গ্রহণ করব।'

২৬. সদস্যদের অভাব-অভিযোগ, সুখ-দুঃখ সবকিছুর খবর রাখতেন বঙ্গবন্ধু এবং প্রয়োজনে তাদের জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করতেন। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে এবং একই বছরের ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান পাস হয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে তা কার্যকর হয়। ১৫ ডিসেম্বর গণপরিষদ বিলুপ্ত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে এত অল্প সময়ের মধ্যে জাতির জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন ছিল নিঃসন্দেহে একটি বিরাট সাফল্য এবং বিশ্বের গণতন্ত্রকামী সকল দেশের জন্য ছিল অনুকরণীয়।

২৭.

জনাব স্পিকার,

সংসদে আরও একটা বিষয় ছিল লক্ষ্যণীয়, পার্লামেন্টে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে স্পিকার বিব্রত হতেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হতেন না। উদার না হলে, গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন না হলে এটা ভাবাই যেত না। ১৯৭৩ সালে পার্লামেন্টে আতাউর রহমান খান, এমএন লারমাসহ বিরোধী দলের কয়েকজন এমপি ছিলেন। তখনও দেখেছি তারা কথা বলতে চাইলেই সুযোগ পেতেন। প্রায় সময় বঙ্গবন্ধুই স্পিকারকে বলে সে সুযোগ করে দিতেন। বিরোধীদলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আলাদা একটা মনোযোগ ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের যত অমিলই থাকুক না কেন বঙ্গবন্ধু কখনো বিরোধীদলের নেতাদের কটাক্ষ করে কিছু বলতেন না বরং তাদেরকে যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। রাজনৈতিক শিষ্টাচার তাঁর জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।

২৮.

জনাব স্পিকার,

বঙ্গবন্ধু সবসময় দেশ ও জনগণের উন্নয়নের পাশাপাশি গণতন্ত্রের উন্নয়ন ও বিকাশের কথা ভাবতেন, গুরুত্বের সাথে বিশ্বাস করতেন সংসদীয় গণতন্ত্রে। যদিও দেশের বিশেষ পরিস্থিতিতে, বঙ্গবন্ধু জাতীয় ঐক্য নিশ্চিতকরণ, দেশের উন্নয়ন এবং দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু পার্লামেন্টে না থাকা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, 'আপনারা amendment করে আমাকে প্রেসিডেন্ট করেছেন, এই সিটে আমি আর বসবো না- এটা কম দুঃখ না। আপনাদের সঙ্গে এই হাউজের মধ্যে থাকবো না- এটা কম দুঃখ নয় আমার।'

২৯.

জনাব স্পিকার,

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, দুর্নীতি ও শোষণহীন সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। জাতির পিতার দর্শন ছিল 'বাংলার মানুষের মুক্তি'। সেই মুক্তি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। তিনি কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। পরিকল্পিত উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু আধুনিক রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন, যা দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) প্রতিফলিত হয়েছিল। তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে এমডিজির অধিকাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ নিম্ন মধ্যআয়ের দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবারের মত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার সকল শর্ত পূরণ করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। কিছু কিছু সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ আজ এশিয়ার সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। পরপর তিন বছর ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক এক-পাঁচ শতাংশে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক দুই-চার শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না হলেও প্রবৃদ্ধির এ হার ছিল এশিয়া এমনকি বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি। দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে দুই হাজার চৌষট্টি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও এখন ৪১ বিলিয়ন ডলারের উপরে।

দেশ স্বাধীন হবার সময় আমাদের গড়আয়ু ছিল ৪৭, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছরের উপরে। প্রাথমিক স্কুলে যাওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় শতভাগ। স্বাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়েই সারাদেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। পোশাক রপ্তানিতে এবং ইন্টারনেট ভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয়, ছাগলের মাংস উৎপাদনে পঞ্চম, ধান উৎপাদনে চতুর্থ, আম উৎপাদনে সপ্তম, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে তৃতীয় এবং পাট রপ্তানিতে প্রথম। কৃষি জমির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেলেও খাদ্য উৎপাদনে আজ আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে ২০০৫ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০.০ শতাংশ সেখানে ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

৩০. বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে সরকার 'রূপকল্প-২০৪১' কে সামনে রেখে বহুমাত্রিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন 'রূপকল্প ২০৪১'-এর প্রধান অভীষ্ট হলো ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান, উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশের মর্যাদায় উত্তরণ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের অবলুপ্তিসহ উচ্চ আয়ের দেশের মর্যাদায় আসীন হওয়া যেখানে মাথাপিছু আয় হবে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২১-২০৪১ মেয়াদে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। সেইসাথে নিশ্চিত করতে হবে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা, ব্যাপক শিল্পায়ন, অর্থনীতি সুসংহতকরণ, নগরায়ন, শতভাগ বিদ্যুতায়ন, জ্বালানি বহুমুখীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলাসহ মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ।

৩১.

জনাব স্পিকার,

স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ এখন সমাপ্তির পথে। মেট্রোরেলের কাজ চলছে, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে বহুলেন টানেল নির্মাণের প্রথম টানেল সমাপ্ত হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পর এবার ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানের এক্সপ্রেস হাইওয়ের যুগে পা রাখল বাংলাদেশ। গত ১২ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে এটি উদ্বোধন করেছেন- যা জাতির জন্য মুজিবর্ষের এক অনন্য উপহার। এছাড়া দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমকে সূচারু ও সহজলভ্য করতে ঢাকা-চট্টগ্রাম নৌ-রুটকে কার্যকর করে তোলার জন্য বৃহৎ একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।

৩২. ক্রীড়া ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছে। অনূর্ধ্ব ১৯ ক্রিকেট দল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। বাংলাদেশের মেয়েরা এশিয়া কাপ ক্রিকেটে শিরোপা জয় করেছে। এছাড়া বিভিন্ন খেলাধুলায়ও এগিয়ে যাচ্ছে।

৩৩. এ সরকারের অন্যতম কৃতিত্ব হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এখনো চলমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এ বিচার অন্যতম মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

৩৪. জলে-স্থলে-আকাশে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বাংলাকে সোনার বাংলা হিসাবে গড়তে চেয়েছিলেন। আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই আরাধ্য কাজ সম্পন্ন করেছেন, বাংলাদেশের স্থল ও সমুদ্রসীমা স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করেছেন। ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে যা সফলভাবে কাজ করছে।

৩৫. নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেছেন, আর্থসামাজিক অগ্রগতিতে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের জন্য উদাহরণ। যে ধরনের কাজের ভিত্তিতে একটা দেশ এগিয়ে যায়, যাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সফল হয়, সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে। এজন্য তিনি মহিলাদের অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন।

৩৬.

জনাব স্পিকার,

১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এদেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শুধু মানবিক বিবেচনায় পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার থেকে আগত প্রায় ১০ লক্ষ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এসব শরণার্থীদের নিজ দেশে সসম্মানে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ বিশ্বফোরামে বারবার বিষয়টি উত্থাপন করেছে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন, গণহত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে উত্থাপিত হয়েছে এবং আদালত মিয়ানমার সরকারের প্রতি প্রাথমিক কিছু নির্দেশনা জারি করেছে। আমরা চাই বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সসম্মানে নিজ দেশে ফিরে যাক। জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশকে আমি এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য পুনরায় আহ্বান জানাচ্ছি।

৩৭.

জনাব স্পিকার,

উন্নয়নের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ নির্মূল, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ও বিকাশ, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন পুরস্কার এবং সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- 'এমডিজি অ্যাওয়ার্ড-২০১০'; 'ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার-২০১০'; 'সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড, ২০১১'; 'ইউনেস্কো কালচারাল ডাইভার্সিটি পদক, ২০১২'; 'এফএও ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড-২০১৩'; 'সাউথ সাউথ কো-অপারেশন অ্যাওয়ার্ড-২০১৩'; ইউনেস্কোর 'শান্তি বৃক্ষ অ্যাওয়ার্ড-২০১৪'; 'Visionary Award-2014'; 'Champion of The Earth Award-2015'; 'Women in Parliament Global Forum Award-2015'; 'ICTs in Sustainable Development Award-2015'; 'Planet 50-50 Champion Award-2016'; 'Agent of Change Award-2016'; এবং 'Global Women's Leadership Award-2018'।

এছাড়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী 'Mother of Humanity' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনুকরণীয়, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব প্রদানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ২০১৮ সালে Inter Press Service News Agency কর্তৃক 'Humanitarian Award' এবং Global Hope Coalition কর্তৃক 'Special Distinction Award for Leadership'-এ ভূষিত করা হয়। ২০১৯ সালে Global Alliance for Vaccine and Immunization কর্তৃক 'ভ্যাকসিন হিরো'; তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশের অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ 'চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড'; ড. কালাম স্মৃতি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক 'ড. কালাম স্মৃতি ইন্টারন্যাশনাল এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০১৯'; ভারতের কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক 'টেগোর পিস অ্যাওয়ার্ড' এবং ২০২০ সালে 'United Nations Public Service Award-2020' ও Institute of South Asian Women কর্তৃক 'Lifetime Contribution for Women Empowerment Award' প্রদান করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রদত্ত এ সকল আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং সম্মাননাসমূহ সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এ বিরল সম্মান দেশ ও জাতির জন্য গৌরবজনক। এজন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই।

৩৮.

জনাব স্পিকার,

বর্তমান সরকার একটি কল্যাণমুখী সরকার। জনকল্যাণের ব্রত নিয়ে এ সরকার দেশ পরিচালনা করছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে মুজিববর্ষে সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ২৯৮টি কর্মসূচি সংবলিত একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা বছরব্যাপী জনকল্যাণধর্মী কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি 'কোটি মানুষের কন্ঠস্বর' শিরোনামে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করেছে।

মুজিববর্ষের উপহার হিসাবে সারাদেশে ১ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং সকলের জন্য আবাসন নিশ্চিতকরণে গৃহহীন-আশ্রয়হীনদের ঘর তৈরি করে দেওয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন উপলক্ষ্যে আপামর জনগণের আর্থিক সহায়তার জন্য চালু করা হয়েছে 'বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বীমা'। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে দেশের ১০০টি উপজেলায় পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল বিতরণ করা হয়েছে। সারাদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুব উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি গ্রহণের ফলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে যাব।

একটি রাজনৈতিক দল যখন এভাবে কাজ করে তখন জাতির উন্নতি ও কল্যাণ নিশ্চিত হয়। সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে দলমত নির্বিশেষে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। মুজিববর্ষে এটাই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।

৩৯.

জনাব স্পিকার,

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস মানবসভ্যতাকে ইতিহাসের এক চরম বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর অপার সম্ভাবনাময় বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। করোনার প্রভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, কর্মহীন হয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। উন্নত বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ইতোমধ্যে করোনায় আমরা অনেককে হারিয়েছি, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন বরেণ্য রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক, নার্সসহ নানা পেশা ও বয়সের মানুষ।

করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ অর্থনীতির সকল সেক্টরে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। জীবনযাত্রায় নেমে আসে অচলাবস্থা। এ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান এবং প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তাঁর এই সময়োচিত সাহসী সিদ্ধান্ত এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশ করোনা পরিস্থিতি সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর সাহসিকতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য আমি আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

৪০.

জনাব স্পিকার,

করোনা সনাক্তকরণ ও কোভিড-১৯-এ আক্রান্তদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুততম সময়ে পিসিআর ল্যাব স্থাপন, মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ মএবং ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ করেছে। এছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। করোনা মহামারীর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিশেষ তহবিল, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রদান, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত ইডিএফ-এর সুবিধা বাড়ানো, স্থগিতকৃত ঋণের আংশিক সুদ মওকুফ, বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে অর্থ বিতরণ, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ সম্মানী প্রদান, কৃষি ভর্তুকি, রপ্তানিমুখী শিল্পের দুঃস্থ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ১ লক্ষ ২০ হাজার ১৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা মোট জিডিপির চার দশমিক তিন-শূন্য শতাংশ। এ সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎপাদনের চাকা সচল রাখা হয়েছে। করোনা মহামারীর ফলে রপ্তানি ক্ষেত্রের গতি যেভাবে হ্রাস পেয়েছিল, আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের ফলে এক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়েছে। এর ফলে গার্মেন্টস সেক্টরের শ্রমিকদের বেকারত্ব এবং অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব নিয়ে যে আশংকা করা হয়েছিল তা নিরসিত হয়েছে।

নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ ও ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা মানুষকে চরম হতাশার মাঝেও আশার আলো দেখিয়েছে। মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে করোনাযুদ্ধে দায়িত্ব পালনে জনপ্রতিনিধি, ডাক্তার, নার্স, প্রশাসন, পুলিশ, সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যসহ যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছেন আমি সেইসব করোনা যোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি এবং তাঁদের বিদেহী মআত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করি। একইসাথে আমি শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

৪১. করোনা ভাইরাস বৈশ্বিক সমস্যা। একক বা আঞ্চলিক ভিত্তিতে এর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আজ আমরা কেউই সুরক্ষিত নই, যতক্ষণ না পর্যন্ত সুরক্ষার জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে। অতীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু, কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষা, হাম, ম্যানিনজাইটিস, পোলিও ইত্যাদি মহামারী ও সংক্রামক ব্যাধিতে কোটি কোটি লোক প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। সময়ের অগ্নিপরীক্ষায় মানুষ এসবের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছে। তাই একসময় যা মহামারী ছিল আজ তা বিশ্ব থেকে নির্মূল হয়েছে। গোটা বিশ্ববাসীর মতো আমরাও আশাবাদী অচিরেই করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কৃত হবে যা গোটা মানবজাতিকে এক চরম অনিশ্চয়তা, হতাশা, উৎকন্ঠা থেকে মুক্তি দেবে। স্বস্তি ফিরে আসবে ঘরে ঘরে। তবে এ ভ্যাকসিন বিশ্বের সকল দেশ ও অঞ্চল যাতে একইসময়ে ও সমভাবে পায় তা নিশ্চিত করতে বিশ্বসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে।

আমি জাতিসংঘসহ বহুজাতিক সংস্থা ও উন্নত বিশ্বকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা এ জেনে আশাবাদী যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যথাসময়ে ভ্যাকসিন পাওয়ার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ০৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, '৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।'

করোনা মহামারি আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করলেও থামিয়ে দিতে পারেনি। আমি আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে করোনাসহ সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে বাঙালি জাতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে এবং গড়ে তুলবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী-সমৃদ্ধ 'সোনার বাংলা'।

৪২.

জনাব স্পিকার,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়। বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা, একটি ইতিহাস। জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই অন্তরালের বঙ্গবন্ধু শক্তিশালী। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে, এদেশের জনগণ থাকবে, ততদিনই বঙ্গবন্ধু সকলের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি বিশ্বকে করেছেন আলোকময়। তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে সে লক্ষ্যে সকলকে উদ্যোগী হতে হবে।

৪৩. এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে আমরা যে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি, তাকে রক্ষা করতে হবে। স্বাধীনতার সুফল প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর 'সোনার বাংলা' গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। জনগণের ঐক্য, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ঐক্য। যে ঐক্য একাত্তরে আমাদেরকে এক করেছিল, সেই ঐক্যই গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, অগণতান্ত্রিকতা, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যারা বাস্তবকে অস্বীকার করে কল্পিত কাহিনী ও পরিস্থিতি বানিয়ে দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে দেশের শান্তি ও অগ্রগতির ধারাকে ব্যাহত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই প্রতিষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা, সার্থক হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন।

এ প্রসঙ্গে আমি বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথের জ্যোতি কবিতার কিছু অংশ পড়ছি- 'ভেঙেছে দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়,

তিমির বিদার উদার অভ্যুদয়, তোমারি হউক জয়।

----------------------------------------------------

----------------------------------------------------

প্রভাত সূর্য এসেছ রুদ্র সাজে, দুঃখের পথে তোমার তূর্য

বাজে-

অরুণ-বহ্নি জ্বালাও চিত্ত মাঝে, মৃত্যুর হোক লয়,

তোমারি হোক জয়।।

৪৪.

জনাব স্পিকার,

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ। নিজে স্বপ্ন দেখতেন এবং মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেন। দেশের মানুষের প্রতি তাঁর আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছিল অপরিসীম। নিজের জীবন উৎসর্গ করে বাংলার মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে গেছেন। ঋণী করে গেছেন বাঙালি জাতিকে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত মুজিববর্ষ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

মুজিববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন-কর্ম, চিন্তা-চেতনা ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের তরুণ প্রজন্মের কাছে। বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন একবিংশ শতাব্দীতেও পরিপূর্ণ

প্রাসঙ্গিক, আধুনিক, যুগোপযোগী এবং ভবিষ্যতেও চির অম্লান থাকবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন ভাবনা ও রাজনৈতিক দর্শনের মর্মার্থ সবার কাছে ছড়িয়ে দিতে মুজিববর্ষ পালন একটি যথাযথ পদক্ষেপ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক আগ্রহ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত 'বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী', 'কারাগারের রোজনামচা', 'আমার দেখা নয়াচীন' আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ দেশ-বিদেশে নতুন প্রজন্মের জন্য বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানার অপার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

আমি আশা করি দেশের বরেণ্য রাজনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সাংবাদিকগণ বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম ও আদর্শ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে জানতে হলে, বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে হবে, বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। এই দুই সত্তাকে আলাদাভাবে দেখার চেষ্টা যারা করেছেন তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। আজকের বাস্তবতা এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে জাতি এগিয়ে যাক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে, নোঙ্গর ফেলুক বঙ্গবন্ধুর 'সোনার বাংলায়'।

আপনাদের সবাইকে আমি আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাই।

জয় বাংলা। খোদা হাফেজ, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

পূর্বপশ্চিমবিডি

সম্পর্কিত খবর
সব খবর
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | বাংলা৫২নিউজ.কম
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি এবং অপরাধ