29 November, 2020
শিরোনাম

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ

 10 Nov, 2020   33 বার দেখা হয়েছে

 নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রিন্ট

জাতিসংঘকে জানানো হবে ১৫ নভেম্বর

আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ (লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি বা এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল (ডেভেলপিং) দেশে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ সিদ্ধান্তের কথা ১৫ নভেম্বর জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

এরপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতিসংঘ সংস্থা দ্য কমিটি ফর ডেভলেপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) প্ল্যানারি সেশনে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্য বলে সুপারিশ করা হবে। মাঝখানে তিন বছরের ট্রানজিশন পিরিয়ড আছে। সেটা শেষ হলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাবে।

সরকারের নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ চায় কি না, তা ১৫ নভেম্বরের মধ্যে জানাতে সরকারকে চিঠি দিয়েছে সিডিপি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হলে তিনি গ্রাজুয়েশন প্রক্রিয়া শুরু করতে নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রেক্ষিতে গ্রাজুয়েশনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ইআরডির ‘সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন’ প্রকল্পের প্রজেক্ট ইমপ্লিমিন্টেশন কমিটির (পিআইসি) সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে ওই সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) নিশ্চিত করেছেন।

আগামী ১৫ নভেম্বর ইউনাইটেড ন্যাশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিলের (ইকোসক) সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিডিপির সঙ্গে অনুষ্ঠেয় ভার্চুয়াল বৈঠকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের বিষয়টি উপস্থাপন করবে বাংলাদেশ।

উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় তিন বছরের ব্যবধানে জাতিসংঘের দুটি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হতে হয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে। এই মূল্যায়নে তিনটি সূচক বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে দুটি সূচকে ভালো করলেই স্বল্পোন্নত কোনো দেশ উন্নয়শীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

সূচক তিনটি হচ্ছে: মাথাপিছু জাতীয় আয়, হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স এবং ইকোনোমিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ভালনারেবিলিটি। ২০১৮ সালের প্রথম মূল্যায়নে বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়।

দ্বিতীয় মূল্যায়নটি হবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে, সিডিপির প্ল্যানারি সভায়। ১৫ নভেম্বরের প্ল্যানারি সভার পর আগামী বছরের ৮-১৫ জানুয়ারি সময়কালে হবে সিডিপির এক্সপার্ট গ্রুপের সভা। সিডিপি মনোনীত ২৮ জন বিশেষজ্ঞ এ সভায় বাংলাদেশের অবস্থান পর্যালোচনা করবেন। তাতে উত্তীর্ণ হলেই সিডিপি গ্রাজুয়েশনের জন্য ইকোসকে বাংলাদেশের নাম সুপারিশ করবে। ইকোসক থেকে তা যাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা, কম সুদে বিদেশি ঋণ ও অনুদান পেয়ে থাকে। ওষুধ উৎপাদনে ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস থেকেও অব্যাহতি পেয়ে আসছে। ওষুধের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলো এই সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত পাবে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা আর থাকবে না। গ্রাজুয়েশনের ঠিক পরপরের এই শক মোকাবেলার জন্য বাংলাদশেসহ এলডিসিভুক্ত দেশগুলো আগামী জুনে অনুষ্ঠেয় বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্সে জিএসপি সুবিধা আরও ১০ বছর বহাল রাখার প্রস্তাব করবে। একইসঙ্গে, ওষুধের ক্ষেত্রে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১০ বছর পর্যন্ত ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস থেকে অব্যাহতি পাওয়ারও প্রস্তাব রাখা হবে।

বাংলাদেশ আশা করছে, ডব্লিউটিও’র বৈঠক থেকে এসব বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।

ঝুঁকি সত্ত্বেও এলডিসি থেকে গ্রাজুয়েশনের বিষয়টি দেশের অর্থনীতির জন্য ‘গর্বের অর্জন’ হবে বলে মনে করছে সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।

‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড কপিং আপ স্ট্র্যাটেজিস অব গ্রাজুয়েশন ফ্রম এলডিসি স্ট্যাটাস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক জিইডির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তরণের পরেও ইউরোপিয়ন ইউনিয়নে পাওয়া বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা অব্যাহত থাকবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। অন্যান্য দেশের দেওয়া জিএসপি সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে গ্রাজুয়েশন ঘোষণার পরপরই। এরপর রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থা মোকাবেলায় যেসব পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বাংলাদেশ, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিভিন্ন দেশ ও আঞ্চলিক জোটের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) স্বাক্ষর, রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, উন্নয়নের দিকে যেতে থাকলে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য বিদ্যমান কিছু সুবিধা বেহাত হবেই। এটা মেনে নিয়েই দেশের মর্যাদা বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ‘দেশের সক্ষমতা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। জিডিপির অনুপাতে বাড়বে রাজস্ব আয়ও। কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ শতাংশে উন্নীত করা গেলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও দেশ বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়বে না।’

গ্রাজুয়েশনের পর রপ্তানি বাণিজ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মো. জাফর উদ্দিন। টিবিএসকে তিনি বলেন, গ্রাজুয়েশনের পরেও ১০ বছর জিএসপি সুবিধা বহাল রাখতে ডব্লিউটিও’র পরবর্তী মিনিস্ট্রিয়াল বৈঠকে জোরালো অবস্থান নেবে বাংলাদেশসহ এলডিসি দেশগুলো।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, চলমান কোভিড পরিস্থিতির দূরবর্তী প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে উন্নত দেশগুলো এলডিসিগুলোর জন্য অবশ্যই কিছু ছাড় দেবে। গ্রাজুয়েশনের কারণে রপ্তানি বাণিজ্য যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের চেষ্টা চলছে। আশা করছি, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। জাপানের সঙ্গে এফটিএ এ বছরই চূড়ান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করতে এফটিএ স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডাব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপান নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে। দেশ তিনটি পৃথকভাবে এ বিষয়ে এলডিসি গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করবে।

বাংলাদেশসহ এলডিসিভুক্ত যেসব দেশ গ্রাজুয়েট হবে, তাদের জন্য এই সুবিধা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে কমিটি ফর ডেভলেপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) রিপোর্টেও। হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সব মিলিয়ে আমরা আশা করছি, ওষুধের ক্ষেত্রে এই সুবিধা অব্যাহত থাকবে।’

এলডিসি থেকে গ্রাজুয়েজন প্রক্রিয়া নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে কাজ করে আসছে ১০ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক এই টাস্কফোর্সের সভাপতি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের সচিবরা এতে যুক্ত রয়েছেন।

টাস্কফোর্সকে বিভিন্ন তথ্য ও মতামত দিয়ে সহায়তা করতে সাত মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে এলডিসি উত্তরণ বিষয়ক কোর গ্রুপ। এই গ্রুপে এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই), বিজিএমইএ এবং চামড়া শিল্পসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

টাস্কফোর্স ও কোর গ্রুপকে কারিগরি ও সাচিবিক সহায়তা দিতে ‘সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন’ প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ইআরডির সচিবের সভাপতিত্বে প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি), প্রকল্প পরিচালকের নেতৃত্বে প্রজেক্ট ইমপ্লিমেনটেশন কমিটি (পিআইসি) ও প্রজেক্ট ইমপ্লিমেনটেশন ইউনিট (পিআইইউ) নামে আলাদা কমিটি রয়েছে।

জাতিসংঘ সংস্থা সিডিপি ও ইকোসকের সঙ্গে যোগাযোগ করার পাশাপাশি গ্রাজুয়েশন পরবর্তী অর্থনীতির সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা ও করণীয় নির্ধারণে এসব কমিটি কাজ করছে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

সম্পর্কিত খবর
সব খবর
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | বাংলা৫২নিউজ.কম
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি এবং অপরাধ