প্রিন্ট করুন

এমপি জাফরকে আওয়ামী লীগের পদ থেকে ‘অব্যাহতি’, বিক্ষোভ

চকরিয়া-পেকুয়া আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলমকে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে ‘অব্যাহতি’ দিয়েছে জেলা কমিটি। একই সঙ্গে তাকে দল থেকে বহিষ্কারে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সরওয়ার আলমকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

জাফর আলমকে দল থেকে অব্যাহতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ হয়েছে। এসময় চকরিয়া পৌর শহরের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়।

 

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে দলীয় পদ থেকে এমপি জাফর আলমকে অব্যাহতির খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন কয়েক হাজার নেতাকর্মী। প্রধান সড়কের প্রায় ৬টি পয়েন্টে টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন নেতাকর্মীরা।  এসময় তারা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। 

 

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রাত ১১টা চকরিয়া থানা রাস্তা মোড়ে নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্যে রাখছিলেন এমপি জাফর আলম।

 

এর আগে বৃহস্পতিবার (১০ জুন) বিকাল ৪টার দিকে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের জরুরী সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সাংসদ জাফরকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হয় বলে জেলা উপ-প্রচার সম্পাদক এম এ মন্জুর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

 

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত জরুরী সভায় জেলা নেতৃবৃন্দ এ সিদ্ধান্ত নেন।

 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৮ জুন চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলমের নেতৃত্বে চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটু ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী পৌরসভার বর্তমান মেয়র এবং আসন্ন নির্বাচনে নৌকার মেয়র প্রার্থী আলমগীর চৌধুরী, চকরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী ও অনেক ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং নৌকা প্রতীকের সমর্থক কর্মীদের মারধর করে মারাত্মক ভাবে আহত করা হয়। জাফর আলম আগেও এ ধরনের আরো অনেক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটান।

 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগেও দুবার বিভিন্ন অপরাধজনক কর্মকাণ্ডের জন্য সাংসদ জাফর আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয় এবং ভবিষ্যতে সংশোধনের স্বার্থে তাকে ক্ষমা করা হয়। এতে আরো স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন তিনি এবং ৮ জুন একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তির মারাত্মক ক্ষতি করেন। তদুপরি তিনি সবসময় জেলা আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জনসম্মুখে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে দলের ভাবমূর্তিকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার মতো কাজ করে।

 

এতে বলা হয়, সাংসদ জাফর আলম স্থগিত পৌরসভা নির্বাচনে দলীয়ভাবে মনোনিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিজ ভাতিজা ‘কুখ্যাত সন্ত্রাসী’ জিয়াবুল হককে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দাঁড় করিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের তার পক্ষে কাজ করতে চাপ সৃষ্টি করে দলীয় প্রার্থীর নির্বাচনের মারাত্মক ক্ষতি করতে থাকেন।

 

সভায় অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন অধ্যাপিকা এথিন রাখাইন, শাহ আলম চৌধুরী রাজা, রেজাউল করিম, কানিজ ফাতেমা আহমদ এমপি, লে. কর্নেল অব. ফোরকান আহমদ, মাহবুবুল হক মুকুল, অ্যাড. আয়াছুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার বদিউল আলম, খালেদ মাহমুদ, এ.টি.এম. জিয়া উদ্দিন চৌধুরী, অ্যাড. মমতাজ আহমদ, মেয়র মকসুদ মিয়া, গিয়াস উদ্দিন, আমিনুর রশিদ দুলাল, সোনা আলী।

 

এসময় উপস্থিত ছিলেন অ্যাড. বদিউল আলম সিকদার, এম. আজিজুর রহমান, মো. শফিক মিয়া, জাফর আলম চৌধুরী, অ্যাড. আব্বাস উদ্দিন চৌধুরী, নুরুল আবছার চেয়ারম্যান, আবুহেনা মোস্তফা কামাল, অ্যাড. ফরিদুল আলম, হেলাল উদ্দিন কবির, ড. নুরুল আবছার, অ্যাড. তাপস রক্ষিত, কাজী মোস্তাক আহমদ শামীম, নুসরাত জাহান মুন্নি, এম.এ. মনজুর, আদিল উদ্দিন চৌধুরী, শফিউল আলম চৌধুরী, অ্যাড. আবদুর রউফ, মিজানুর রহমান, জি.এম. আবুল কাসেম, বদরুল হাসান মিল্কী, উম্মে কুলসুম মিনু প্রমুখ।

 

উল্লেখ্য, সাবেক জাসদ-বাসদ নেতা জাফর আলম বিগত সময়ে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে চকরিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতিকে মারধর করে মারাত্মক আহত করার অভিযোগে অভিযুক্ত। এ ব্যাপারে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক চকরিয়া থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে তাকে নিজ হাতে মারধর করেন।

 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় উপস্থিত সকল সদস্যের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে জাফর আলমকে সাময়িক অব্যাহতি প্রদান এবং ইতিপূর্বে সাময়িক অব্যাহতিপ্রাপ্ত চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলাম লিটুকে কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাদের দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের নিকট সুপারিশ প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

 

এদিকে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে পৌরসভা এলাকায় নির্বাচনী প্রচার শেষে পৌর ভবনের পাশে চিংড়ি চত্বর এলাকায় বসেন চকরিয়া পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আলমগীর চৌধুরী, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিক উদ্দিন চৌধুরী, যুবলীগের নেতা রেফায়েত সিকদারসহ ৪০-৫০ নেতাকর্মী।

 

ওই সময় বেতুয়া বাজার এলাকায় এক বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজা শেষে পৌরসভার চিংড়ি চত্বর এলাকা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন কক্সবাজার-১ আসনের (চকরিয়া-পেকুয়া) সাংসদ জাফর আলম।

 

ওই এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেখে প্লাস্টিকের লাঠি হাতে গাড়ি থেকে নামেন সাংসদ। এ সময় কয়েকজন কর্মী-সমর্থককে পিটুনি দেন তিনি। তার সঙ্গে থাকা ডুলাহাজারা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাসানুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের নেতা আতিক ও যুবলীগের নেতা রেফায়েত সিকদারকে ধাক্কা দেন। এতে তারা আহত হন। ওই সময় চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত সভাপতি জাহেদুল ইসলামও সাংসদের গাড়ি থেকে নেমে কয়েকটি চেয়ার ভাঙচুর করেন। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা মেয়র আলমগীর চৌধুরী সাংসদকে গাড়িতে তুলে দিলে তিনি বাড়ি ফিরে যান। তবে খবর ছড়িয়ে পড়ে মেয়র প্রার্থী আলমগীর চৌধুরীর ওপর প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা করেছে। এ খবরে মেয়র প্রার্থীর বাড়ির এলাকা কাহারিয়াঘোনা থেকে শতাধিক কর্মীসমর্থক লাঠিসোটা নিয়ে চিংড়ি চত্বর এলাকায় যান। আলমগীরের কর্মী-সমর্থকেরা সাংসদ জাফর আলম ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জিয়াবুল হকের (সাংসদের ভাতিজা) বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।

 

মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, সাংসদ হঠাৎ গাড়ি থেকে নেমে লাঠি হাতে নেতাকর্মীদের তাড়া করেন। তার সঙ্গে থাকা হাসানুল ইসলাম ও জাহেদুল ইসলাম আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গায়ে হাত তোলেন।

 

আলমগীর চৌধুরী বলেন, ‘সাংসদের ভাতিজা জিয়াবুল হক ২১ জুন অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে মেয়র পদে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। তা ছাড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া জাহেদুল ইসলাম সাংসদের অনুসারী। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষাণ্বিত হয়ে ও জাহেদুলকে অব্যাহতির খবরে সাংসদ এমন আচরণ করেছেন।’

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাংসদ জাফর আলম বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বানের জানাজা শেষে বাড়ি ফেরার পথে কয়েকজন ছেলে আমার গাড়ির গতিরোধ করে স্লোগান দিতে থাকে। এমন সময় আমি প্লাস্টিকের একটি লাঠি হাতে গাড়ি থেকে বের হয়ে এক ছেলেকে আঘাত করতেই অন্যান্য ছেলেরা পালিয়ে যায়। এ সময় মেয়র আলমগীর এসে আমার পায়ে ধরে বলে, ‘ছেলেরা ভুল করেছে। মাফ করে দেন।’ তখন আমি গাড়িতে উঠে বাড়িতে চলে আসি। এখানে কাউকে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেনি। এসব অবাস্তব ও অবান্তর কথা।’সূত্র-দেশ রূপান্তর 


সম্পাদক ও প্রকাশক : প্রভাষক কাজী আওলাদ হোসেন

১৪৬, (৪র্থ তলা), রোড-০২, ব্লক-এ, সেকশন-১২, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬

ফোন: +৮৮০২ ৫৮১৫৪৭৭৫ | নিউজ রুম: +৮৮০১৭২৩-১২৭৬২৫ | ই-মেইল: [email protected]