একদলীয় শাসনব্যবস্থায় ভালো থাকবেন সাধারণ মানুষ। সেক্ষেত্রে এমন নেতা প্রয়োজন যিনি দেশের উন্নয়নের জন্য নিয়মের তোয়াক্কা করবেন না। এ কারণে অধিকাংশ আরবের বিশ্বাস দুর্বল অর্থনীতির জন্য দায়ী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। বুধবার প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি জরিপের তথ্য-উপাত্ত বলছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাজুড়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন আরবরা। বিবিসি।

আরবি বিবিসি নিউজের পক্ষে ৯টি আরব দেশ এবং ফিলিস্তিনি অঞ্চলজুড়ে প্রায় ২৩ হাজার লোকের সাক্ষাৎকার নিয়ে জরিপটি সম্পন্ন করেছে আরব ব্যারোমিটার নেটওয়ার্ক। জরিপের অধিকাংশই মত দিয়েছেন, গণতন্ত্রের অধীনে অর্থনীতি দুর্বল। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আহ্বান জানানো তথাকথিত আরব বসন্তের বিক্ষোভের ঠিক এক দশক পর এই ফলাফল পাওয়া গেল। বিক্ষোভের দুই বছরেরও কম সময় পরে সেই দেশগুলোর মধ্যে একটিতে এখনো গণতন্ত্র বিদ্যমান।

সেটি হচ্ছে তিউনিসিয়া। গত সপ্তাহে প্রকাশিত একটি খসড়া সংবিধান পাশ হলে দেশটিও চলে যাবে কর্তৃত্ববাদীদের দখলে। আরব ব্যারোমিটারের পরিচালক মাইকেল রবিনস বলেন, ‘এই অঞ্চলের জনগণের ক্রমবর্ধমান উপলব্ধি হচ্ছে-গণতন্ত্র নিখুঁত সরকার দিতে পারে না। সবকিছু নির্ধারণ কিংবা ঠিক করার ক্ষমতা গণতন্ত্রের নেই।’

রবিনস আরও বলেন, ‘এই অঞ্চলের ক্ষুধার্ত মানুষের প্রয়োজন রুটি। তারা সিস্টেমে হতাশ।’ জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ দেশের অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা মত দিয়েছেন- গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে অর্থনীতি দুর্বল। জরিপে সম্পৃক্ত প্রতিটি দেশের অর্ধেকেরও বেশি লোক বলেছেন, তারা একমত, কখনো কখনো দৃঢ়ভাবে একমত যে তাদের সরকারের নীতির কার্যকারিতা সম্পর্কে বেশি উদ্বিগ্ন-সরকারের ধরন নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।

ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) গণতন্ত্র সূচক বলছে, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা সূচকে অন্তর্ভুক্ত সব অঞ্চলের মধ্যে তলানিতে রয়েছে। সূচক অনুযায়ী ইসরাইল রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র শ্রেণিতে। ‘হাইব্রিড শাসন’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তিউনিসিয়া ও মরক্কো। বাকি অঞ্চল রয়েছে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শ্রেণিতে।

সাতটি আরব দেশ এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলে আরব ব্যারোমিটার সমীক্ষায় অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা মত দিয়েছেন-তাদের দেশে এমন একজন নেতার প্রয়োজন যিনি নিয়মের তোয়াক্কা করবেন না। অর্থাৎ যিনি প্রয়োজনে নিয়ম ভাঙতে পারবেন। শুধু মরক্কোতে অর্ধেকেরও কম মানুষ এই মতটিকে সমর্থন দিয়েছেন। তবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, জর্ডান এবং সুদানের উল্লেখযোগ্য মানুষ এই মতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

২০১১ সালের আরব বসন্ত বিদ্রোহের পর তিউনিসিয়াই একমাত্র দেশ-যেটি একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে পেরেছিল। যাই হোক, তিউনিসিয়া প্রেসিডেন্ট কয়েস সাঈদের অধীনে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ২০২১ সালের জন্য ইআইইউ গণতন্ত্র সূচক অনুসারে দেশটির ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ শ্রেণি থেকে ‘হাইব্রিড শাসন’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আরব ব্যারোমিটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রিন্সটন স্কুল অব পাবলিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনালের ডিন আমানি জামাল বলেন, ‘এখন দুর্ভাগ্যবশত তিউনিসিয়া কর্তৃত্ববাদের দিকে ফিরে যাচ্ছে-যাকে আমরা বলি গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসারণ। সারা বিশ্বেই আজ এ প্রবণতা রয়েছে।’

জরিপ করা প্রতিটি দেশে অন্তত তিনজনের মধ্যে একজন এই বিবৃতির সঙ্গে একমত হয়েছেন যে, গত এক বছরে তাদের কাছে খাদ্য কেনার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না। খাদ্য নিয়ে লড়াই তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল মিসর এবং মৌরিতানিয়ায়। যেখানে তিনজনের মধ্যে দুজনই বলেছেন-প্রায়ই তারা খাদ্য নিয়ে হতাশায় ভুগেছেন।

ডক্টর রবিনস বলেন, ‘ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই অঞ্চলের নাগরিকরা বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে। যেমন চীনা মডেল, একটি কর্তৃত্ববাদী এক-দলীয় ব্যবস্থা-যার অধীনে গত ৪০ বছরে বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এই ধরনের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেক মানুষই খুঁজছেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x