ঢাকা , সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড: আটক আনাসকে ছেড়ে দিয়েছে এসআরবি আশুলিয়ায় সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে আগুন, নিহত ১ আহত ১৭ কক্সবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রীনিবাসে পুলিশের অভিযান; ২০ হাজার ইয়াবাসহ শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী পুলিশ হেফাজতে কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকের ওপর হামলায় সংসদ সদস্যের ছেলে-ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়কসহ ৮ নেতাকর্মী বহিষ্কার, ১ জনকে শোকজ আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ থেকে আগুন স্কুল-কলেজের ছুটির তালিকা সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

ফেলানী হত‍্যার ১৫ বছরেও ভারতে ঝুলে আছে মামলা! বিচারের আশায় ফেলানীর পরিবার

রনবীর রায় রাজ (ফুলবাড়ী) কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

কুড়িগ্রাম সীমান্তে বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হলো বুধবার (৭ জানুয়ারি)। দেশ-বিদেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করা এই নির্মম ঘটনার বিচার এখনো ভারতের উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকায় হতাশায় দিন কাটছে ফেলানীর বাবা-মা ও স্বজনদের।

সীমান্তবাসী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেলানী হত্যার ন্যায় বিচার নিশ্চিত হলে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে বাংলাদেশে ফেরার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘ সময় কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মরদেহের ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে দুই দফায় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেন আদালত, যা ফেলানীর পরিবারের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ন্যায় বিচারের আশায় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহায়তায় ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতের উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। এরপর একাধিকবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও তা পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পার হলেও মামলাটি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি এলেই বুক ফেটে কান্না আসে। আমার মেয়ের লাশ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল—এই দৃশ্য আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। অমিয় ঘোষের ফাঁসি হলে তবেই আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে।” তিনি জানান, ন্যায় বিচারের আশায় আজও ভারতের উচ্চ আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।

ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, “১৫ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু এখনো ন্যায় বিচার পেলাম না। কয়েকবার ভারতের আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছি। উচ্চ আদালতে রিট করেছি। এখনো আশা ছাড়িনি-একদিন বিচার পাব।”

স্থানীয় বাসিন্দারাও ফেলানী হত্যার বিচার দাবি করছেন। ফেলানীর প্রতিবেশী আলামিন বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচার হলে সীমান্তে হত্যার ঘটনা অনেক কমে যাবে। এটা শুধু ফেলানীর পরিবারের নয়, পুরো সীমান্ত এলাকার মানুষের দাবি।”

আইনজীবীরাও মনে করেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা রিট পিটিশনটির দ্রুত শুনানি ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে সীমান্তে বিএসএফের হাতে হত্যাকাণ্ড কমে আসবে। কুড়িগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফখরুল ইসলাম বলেন, “ফেলানীর হত্যাকারীর বিচার নিশ্চিত করা গেলে বিএসএফ সদস্যরা আর এমন অপরাধ করতে সাহস পাবে না। এতে সীমান্ত হত্যা বন্ধের পথ সুগম হবে।”

উল্লেখ্য, নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলনিটারী গ্রামের নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন ফেলানী। পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে কাজের সন্ধানে তারা সপরিবারে ভারতে যান। পরে ফেলানীর বিয়ের জন্য দালালের মাধ্যমে দেশে ফেরার সময়ই সীমান্তে প্রাণ হারায় কিশোরীটি।

কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর সেই ছবি আজও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। কিন্তু ১৫ বছর পেরিয়েও বিচার ঝুলে থাকায় প্রশ্ন থেকেই যায়-ফেলানীর ন্যায় বিচার কবে পাবে?

ফেলানী হত্যা দিবস ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম সীমান্ত হত্যা বিএসএফ অমিয় ঘোষ ফেলানী হত্যার ১৫ বছর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন নুর ইসলাম জাহানারা বেগম

ট্যাগ :

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ০৭:০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
৬৯০ Time View

ফেলানী হত‍্যার ১৫ বছরেও ভারতে ঝুলে আছে মামলা! বিচারের আশায় ফেলানীর পরিবার

আপডেটের সময় : ০৭:০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

কুড়িগ্রাম সীমান্তে বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুন হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পূর্ণ হলো বুধবার (৭ জানুয়ারি)। দেশ-বিদেশে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করা এই নির্মম ঘটনার বিচার এখনো ভারতের উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকায় হতাশায় দিন কাটছে ফেলানীর বাবা-মা ও স্বজনদের।

সীমান্তবাসী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেলানী হত্যার ন্যায় বিচার নিশ্চিত হলে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড বন্ধে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে বাংলাদেশে ফেরার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘ সময় কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর মরদেহের ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে দুই দফায় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেন আদালত, যা ফেলানীর পরিবারের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ন্যায় বিচারের আশায় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর সহায়তায় ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতের উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। এরপর একাধিকবার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও তা পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পার হলেও মামলাটি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, “প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি এলেই বুক ফেটে কান্না আসে। আমার মেয়ের লাশ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল—এই দৃশ্য আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। অমিয় ঘোষের ফাঁসি হলে তবেই আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে।” তিনি জানান, ন্যায় বিচারের আশায় আজও ভারতের উচ্চ আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।

ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন, “১৫ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু এখনো ন্যায় বিচার পেলাম না। কয়েকবার ভারতের আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছি। উচ্চ আদালতে রিট করেছি। এখনো আশা ছাড়িনি-একদিন বিচার পাব।”

স্থানীয় বাসিন্দারাও ফেলানী হত্যার বিচার দাবি করছেন। ফেলানীর প্রতিবেশী আলামিন বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচার হলে সীমান্তে হত্যার ঘটনা অনেক কমে যাবে। এটা শুধু ফেলানীর পরিবারের নয়, পুরো সীমান্ত এলাকার মানুষের দাবি।”

আইনজীবীরাও মনে করেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা রিট পিটিশনটির দ্রুত শুনানি ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা হলে সীমান্তে বিএসএফের হাতে হত্যাকাণ্ড কমে আসবে। কুড়িগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ফখরুল ইসলাম বলেন, “ফেলানীর হত্যাকারীর বিচার নিশ্চিত করা গেলে বিএসএফ সদস্যরা আর এমন অপরাধ করতে সাহস পাবে না। এতে সীমান্ত হত্যা বন্ধের পথ সুগম হবে।”

উল্লেখ্য, নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলনিটারী গ্রামের নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন ফেলানী। পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে কাজের সন্ধানে তারা সপরিবারে ভারতে যান। পরে ফেলানীর বিয়ের জন্য দালালের মাধ্যমে দেশে ফেরার সময়ই সীমান্তে প্রাণ হারায় কিশোরীটি।

কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর সেই ছবি আজও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। কিন্তু ১৫ বছর পেরিয়েও বিচার ঝুলে থাকায় প্রশ্ন থেকেই যায়-ফেলানীর ন্যায় বিচার কবে পাবে?

ফেলানী হত্যা দিবস ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রাম সীমান্ত হত্যা বিএসএফ অমিয় ঘোষ ফেলানী হত্যার ১৫ বছর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন নুর ইসলাম জাহানারা বেগম