কলমাকান্দায় আদিবাসী দিবস পালন
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৫৮ মি শায়েখ আবদাল খান
“আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়েছে। শনিবার (৯ আগস্ট) নলছাপ্রা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে টিডব্লিউএ কলমাকান্দা শাখার আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এতে বারসিকসহ বিভিন্ন সমমনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
দিবসটি উপলক্ষে সকালে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, শিশু, যুব, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারীরা আদিবাসী জীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরে র্যালিটি অনুষ্ঠানস্থলে এসে শেষ হয়।
র্যালি শেষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। টিডব্লিউএ কলমাকান্দা শাখার চেয়ারম্যান মুকুট স্নাল-এর সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ডিএসকে-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. দিবালোক সিংহ। এতে বারসিকসহ বিভিন্ন সমমনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, নারী ও যুব প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, কৃষি, খাদ্যাভ্যাস, বীজ সংরক্ষণ, লোকচিকিৎসা, বন ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা গড়ে উঠেছে, তা বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় জ্ঞান ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে এসব জ্ঞান ও চর্চার অনেক কিছু হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করে এসব জ্ঞান সংরক্ষণ ও চর্চা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
বক্তারা বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান শুধু সংস্কৃতির অংশ নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় কৃষি, খাদ্য বৈচিত্র্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, দেশীয় কৃষিপদ্ধতি, বুনো খাদ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের বিভিন্ন চর্চার মধ্যে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নিহিত রয়েছে। এসব জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে নথিভুক্ত ও প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে দর্শনার্থীদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল আদিবাসী পোশাক ও বুনো খাদ্য বৈচিত্র্য প্রদর্শনী। বিভিন্ন স্টলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক, স্থানীয় উপকরণ এবং নানা ধরনের বুনো ও স্থানীয় খাদ্য প্রদর্শন করা হয়। বুনো শাক, কন্দ, ফলসহ বিভিন্ন স্থানীয় খাদ্য উপকরণ প্রদর্শনের পাশাপাশি এগুলোর সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়।
প্রদর্শনীতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের নানা দিক ফুটে ওঠে। আয়োজকদের মতে, বুনো খাদ্য শুধু খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রজন্মান্তরে চলে আসা জ্ঞানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এরপর অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পরিবেশিত হয়। নৃত্য ও সংগীতের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, প্রকৃতি, কৃষি, উৎসব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা দিক।
আয়োজকরা জানান, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য হলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্য ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের বৈচিত্র্যকে বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরা এবং এসব জ্ঞান ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরি করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্থানীয় জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পৌঁছে দিতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
র্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আদিবাসী পোশাক ও বুনো খাদ্য বৈচিত্র্য প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের কর্মসূচি শেষ হয়।





















