নিচের গ্রেডের চেয়ে ওপরের গ্রেডের বেতন কম
গ্রেড যত ওপরে, মোট বেতন তত বেশি– এমন স্বাভাবিক চিত্র নতুন বেতন কাঠামোয় সব ক্ষেত্রে থাকছে না। বাড়ি ভাড়া ভাতার হারে বড় পার্থক্যের কারণে কিছু ক্ষেত্রে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা ঊর্ধ্বতন গ্রেডের চেয়ে মোট বেতন বেশি পাবেন। এতে সরকারি চাকরির বেতন কাঠামোয় তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘উল্টো সিঁড়ি’। এ নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ।
নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ গ্রেডের তুলনায় ১৬ গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ৯৭৫ টাকা বেশি। আবার ১৭ গ্রেডের কর্মচারীরা ১৫ গ্রেডের চেয়ে ২৫০ টাকা বেশি পাবেন। অথচ ১৫ গ্রেডের মৌলিক বেতন উভয় গ্রেডের চেয়ে বেশি। মূলত বাড়ি ভাড়া ভাতার হার পরিবর্তনের কারণেই এমন অস্বাভাবিক ব্যবধান তৈরি হয়েছে। একইভাবে ১৪ গ্রেডের তুলনায় ১৬ গ্রেডের কর্মচারীর মোট বেতন ৩০ টাকা বেশি।
জানা যায়, শতকরা হারের পাশাপাশি ন্যূনতম বাড়ি ভাড়া নির্ধারণ না করায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। সচিব কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের পর অর্থ বিভাগের যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা নতুন পে স্কেল নিয়ে যতবার কাজ করেছেন, ততবার নানা ধরনের ভুল ধরা পড়েছে। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল দ্রুত গেজেট প্রকাশ করতে হবে। এজন্য অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাড়াহুড়া করে গেজেট প্রকাশ করায় এমন ভুল হয়েছে।
অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা) মো. নাজমুল হুদা সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে বলার কিছু নেই। এ বিষয়ে আমি অবহিত নই।’ আপনি নতুন পে স্কেল যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে ছিলেন, সে হিসেবে আপনার বক্তব্য কী– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু না, এটা ভিন্ন উইংয়ের কাজ। এটা আমার দায়িত্বাধীন না, এজন্য ভিন্ন কর্মকর্তা রয়েছেন।’
গেজেট প্রকাশের পর এ নিয়ে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের নেতারা অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। কর্মকর্তারা তাদের জানিয়েছেন, এই ভুলের জন্য আমাদের কিছু করার নেই। আমরা সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করেছি।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী সমকালকে বলেন, গতকাল ১২টি সংগঠনের জোট মিলে আমরা বৈঠক করেছি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে– নতুন বেতন কাঠামোর অসংগতিগুলো সংশোধন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও অর্থ সচিবের কাছে লিখিত আবেদন করব।
গেজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ গ্রেডে মৌলিক বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা। এর সঙ্গে ৩৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া ৭ হাজার ৯৮০ টাকা, চিকিৎসা ৩ হাজার, টিফিন ৫০০ এবং মোবাইল ১৫০ টাকা যোগ হয়ে মোট বেতন দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪৩০ টাকা। বিপরীতে ১৬ গ্রেডে মৌলিক বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা, অর্থাৎ ৯০০ টাকা কম। কিন্তু বাড়ি ভাড়া ৪৫ শতাংশ হওয়ায় এই খাতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। চিকিৎসা ৩ হাজার, টিফিন ৫০০ ও মোবাইল ১৫০ টাকা যোগ করে মোট দাঁড়াচ্ছে ৩৫ হাজার ৪০৫ টাকা। অর্থাৎ ১৫ গ্রেডের চেয়ে ১৬ গ্রেডে মোট বেতন বেশি ৯৭৫ টাকা।
একইভাবে ১৭ গ্রেডে মৌলিক বেতন ২১ হাজার ৪০০ টাকা। বাড়ি ভাড়া ৪৫ শতাংশ হিসেবে ৯ হাজার ৬৩০ টাকা, চিকিৎসা ৩ হাজার, টিফিন ৫০০ ও মোবাইল ১৫০ টাকা মিলিয়ে মোট ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকা। অর্থাৎ মৌলিক বেতনে ১৫ গ্রেডের চেয়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা কম হলেও মোট বেতন ২৫০ টাকা বেশি।
অন্যদিকে ১৪ গ্রেডে মৌলিক বেতন ২৩ হাজার ৭০০ টাকা। ৩৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া ৮ হাজার ২২৫ টাকা, চিকিৎসা ৩ হাজার, টিফিন ৫০০ ও মোবাইল ১৫০ টাকা যোগে মোট দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩৭৫ টাকা। এতে ১৪ গ্রেডের চেয়ে ১৬ গ্রেডে মোট বেতন বেশি ৩০ টাকা।
পদোন্নতিতে বাড়ি ভাড়া কমবে
সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির সঙ্গে সাধারণত কর্মচারীর আর্থিক সুবিধা বাড়ার কথা। কিন্তু নতুন বেতন কাঠামোর এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে— উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পেলে যদি বাড়ি ভাড়া ভাতার হার কমে যায়, তাহলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোট মাসিক প্রাপ্যও কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়বে না। বিশেষ করে একই কর্মস্থলে কর্মরত দুই গ্রেডের কর্মচারীর ক্ষেত্রে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী যদি বাড়ি ভাড়া বাবদ তুলনামূলক বেশি পান, তাহলে বেতন কাঠামোর গ্রেডভিত্তিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হবে। বৈশাখী ভাতা নিয়েও বিদ্যমান সুবিধার সঙ্গে প্রস্তাবিত বেতন স্কেলের তুলনা করেছে কর্মচারী সংগঠনগুলো। এতে বিদ্যমান ২০ শতাংশের বিপরীতে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় মূল বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত হলে ৬৫ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৫ হাজার ৬০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পান চাকরিজীবীরা। ৯ হাজার ৭০১ টাকা থেকে ১৬ হাজার টাকা মূল বেতন হলে ৬০ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৬ হাজার ৪০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। মূল বেতন ১৬ হাজার ১ টাকা থেকে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা হলে ৫৫ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ৯ হাজার ৬০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। আর মূল বেতন ৩৫ হাজার ৫০১ টাকার বেশি হলে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫০ শতাংশ হারে, তবে ন্যূনতম ১৯ হাজার ৫০০ টাকা বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রে বর্তমানে বাড়ি ভাড়ার হার ও ন্যূনতম অঙ্কে ভিন্নতা রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোতে শুধু শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, ন্যূনতম টাকা নির্ধারণ করা হয়নি। এজন্য এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।






















সাইফউদ্দিনের জায়গায় আলিস আল ইসলাম!