হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক জাহাজডুবি, নতুন কৌশলে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে উত্তেজনা। একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, অগ্নিকাণ্ড ও জাহাজডুবির ঘটনায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নৌপথটিতে ইরানের পরিবর্তিত কৌশল নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টার সময় একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে আগুন ধরে যায়। দেশটির সামরিক বাহিনীর দাবি, ট্যাঙ্কারটি নিজের অবস্থান শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ রেখে নিষিদ্ধ জলসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল।
তবে জাহাজটিতে কীভাবে আগুন লেগেছে কিংবা এ ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে তেহরান। বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোও এ কৌশলের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির কাছে গত মঙ্গলবার দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পৃথক হামলায় জাহাজ দুটিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলার মতো বস্তু আঘাত হানে। পরে বুধবারের আগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাহাজ দুটি ডুবে যায়।
ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর একটি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘জিএফএস প্রাইড’। ২ হাজার ৮২৪ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজটিতে মঙ্গলবার হামলার পর আগুন ধরে যায়। একপর্যায়ে সেটি ডুবে যায়।
সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি জানিয়েছে, জাহাজটিতে থাকা ২১ জন নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্য জাহাজটি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী ‘কেপ ডাও’। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাহাজটিতে প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে একজন নাবিক নিহত হন। অন্য নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছে ডুবে যায়।
জাহাজটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পিওনিজ শিপম্যানেজমেন্ট এফজেডই এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
আইএমওর নথি অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে নথিভুক্ত জাহাজডুবির মধ্যে ‘জিএফএস প্রাইড’ দ্বিতীয় এবং ‘কেপ ডাও’ তৃতীয় ঘটনা।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার মধ্যেই দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে।
পেজেশকিয়ানের ভাষায়, ‘বিপ্লবের পর গত ৪৮ বছরে আমরা কখনো এত তীব্র অবরোধ, যুদ্ধ ও সংকটের মুখোমুখি হইনি।’
ইরানি প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে দেশটির জনগণের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলছে। অর্থনৈতিক দুর্ভোগ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি এবং সেই ক্ষোভকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ দেওয়াই ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, জনগণকে ক্ষুব্ধ করে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে চায়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক হামলা ও জাহাজডুবির ঘটনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে তেল পরিবহন ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।






















৮০ লাখ টাকার কাপড় নিয়ে উধাও, চারদিন পর খালি ট্রাক উদ্ধার; গ্রেপ্তার ২