05 March, 2021
শিরোনাম

বরফের নিচে গোপন পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণে ভারতে হিমবাহ ধস!

 21 Feb, 2021   70 বার দেখা হয়েছে

 নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রিন্ট

ভারতের হিমালয় সংলগ্ন উত্তরাখন্ড রাজ্যে দু'সপ্তাহ আগে হিমবাহ ধসের ঘটনায় অর্ধশতাধিক লোক নিহত হন। বরফের ভেতরে লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্ফোরণের ফলে এ হিমবাহ ভেঙে পড়ে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

বিবিসি জানায়, বরফের নিচে কিছু পারমাণবিক অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে এমন বিশ্বাস প্রচলিত আছে রাইনি এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে। সেই বোমাগুলোর কোনো একটি বিস্ফোরিত হয়েই ওই ধসের ঘটনা ঘটেছিল তাদের ধারণা।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, চামোলি জেলায় হিমালয়ের নন্দাদেবী শৃঙ্গের কাছে হিমবাহের একটি অংশ হঠাৎ ভেঙে পড়েছিল এবং তার ফলে অলকানন্দা ও ধৌলিগঙ্গা নদীতে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয় যা অনেক বাড়িঘর ও স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে, রাইনির গ্রাম প্রধান সংগ্রাম সিং রাওয়াত বলছেন, ‘আমাদের মনে হয় লুকানো বোমাগুলোর একটা ভূমিকা আছে। শীতকালে একটা হিমবাহ কীভাবে ভেঙে পড়তে পারে? আমরা মনে করি সরকারের উচিত ব্যাপারটার তদন্ত করা এবং বোমাগুলো খুঁজে বের করা।’

 

তাদের এই ধারণার পেছনে আছে স্নায়ুযুদ্ধের যুগের এক বিচিত্র কাহিনি। ষাটের দশকে এই এলাকাটিতে কিছু বিচিত্র গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা ঘটেছিল।

এতে জড়িত ছিল তৎকালীন কিছু শীর্ষ পর্বতারোহী, ইলেকট্রনিক স্পাইং সিস্টেম চালানোর জন্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ এবং কিছু গুপ্তচর।

সে সময় চীন পারমাণবিক বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মালিক হওয়ার জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিল। আর তার ওপর নজর রাখতে ১৯৬০-এর দশকে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তারা চীনের পারমাণবিক পরীক্ষা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ওপর নজরদারি করতে হিমালয় এলাকায় পরমাণু শক্তিচালিত কিছু যন্ত্র স্থাপনের কাজে ভারতের সাহায্য নিয়েছিল।

এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত লেখালিখি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘রক এ্যান্ড আইস ম্যাগাজিনের’ সাংবাদিক পিট তাকেডা।

তিনি বলেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধের যুগের সন্দেহবাতিক তখন চরমে উঠেছে। কোন পরিকল্পনাকেই তখন পাগলামি বলে উড়িয়ে দেয়া হতো না, যত অর্থই লাগুক তা পেতে অসুবিধা হতো না, এবং এ জন্য কোন পন্থা নিতে কেউ দ্বিধা করতো না।’

চীন তার প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় ১৯৬৪ সালে। তারপরের বছর অক্টোবর মাসে একদল ভারতীয় ও আমেরিকান পর্বতারোহী সাতটি প্লুটোনিয়াম ক্যাপসুল এবং নজরদারির যন্ত্রপাতি নিয়ে নন্দাদেবী শৃঙ্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

প্লুটোনিয়াম ক্যাপসুলগুলোর ওজন ছিল প্রায় ৫৭ কেজি। এর সঙ্গে ছিল দুটি রেডিও কমিউনিকেশন সেট, আর একটি ছয় ফুট লম্বা এ্যান্টেনা। কথা ছিল, পর্বতারোহীরা সেগুলো নিয়ে ২৫ হাজার ৬৪৩ ফিট উঁচু নন্দাদেবী শৃঙ্গের ওপর স্থাপন করবে। এই শৃঙ্গের অবস্থান চীন সীমান্তের কাছেই।

কিন্তু দলটির যখন শৃঙ্গের কাছাকাছি পৌঁছে, তখন প্রচণ্ড তুষার ঝড়ের কবলে পড়ে তারা। পর্বতারোহী দলটি তাদের যাত্রা বন্ধ করতে বাধ্য হলো। যন্ত্রপাতিগুলো একটা মাচার মতো প্ল্যাটফর্মের ওপর রেখে তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে যায় দলটি।

একটি সাময়িকীর রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা এগুলো রেখে এসেছিলেন পর্বতের গায়ে একটা খাঁজের মধ্যে।

পরের বছর বসন্তকালে পর্বতারোহীরা আবার ফিরে আসেন, যন্ত্রপাতিগুলো খুঁজে বের করে শৃঙ্গে নিয়ে যেতে। কিন্তু তারা সেখানে পৌঁছে দেখলেন, যন্ত্রপাতিগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে।

এরপর ৫০ বছরেরও বেশি পার হয়ে গেছে। নন্দাদেবী শৃঙ্গে একাধিক দল আরোহণ করেছেন। কিন্তু ক্যাপসুলগুলোর কি হলো- তা আজও কেউ জানেন না।

তাকেডা বলছেন, ‘হয়তো সেই হারানো প্লুটোনিয়াম কোনো হিমবাহের নিচে চাপা পড়ে আছে, হয়তো ভেঙেচুরে ধুলোয় মিশে গেছে , এবং ভাসতে ভাসতে তা গঙ্গার উৎসমুখের দিকে যাচ্ছে।’

কিন্তু ব্যাটারিতে আসলে প্লুটোনিয়াম-২৩৮ নামে একটা আইসোটোপ বা বিশেষ ধরনের প্লুটোনিয়াম ব্যবহৃত হয়। এর ‘হাফ লাইফ’ (যতদিন একটা আইসোটোপ তার তেজস্ক্রিয়তা অর্ধেক হারিয়ে ফেলে) হচ্ছে ৮৮ বছর।

নন্দাদেবী নিয়ে একটি বই লিখেছেন ব্রিটিশ লেখক হিউ টমসন। তিনি লিখেছেন, স্থানীয় লোকেরা যাতে সন্দেহ না করে সে জন্য আমেরিকান পর্বতারোহীদের চামড়ার রং তামাটে করার ক্রিম লাগাতে বলা হয়েছিল।

তাদের অভিযানের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল - অত উঁচুতে উঠলে অক্সিজেনের অভাবে মানবদেহে কি প্রতিক্রিয়া হয় তা পরীক্ষা করতেই এ অভিযান।

যে মালবাহী কুলিরা পারমাণবিক যন্ত্রপাতি বহন করছিলেন তাদের বলা হয়েছিল- এতে সোনা বা ওই জাতীয় কোনো ধনরত্ন আছে।

১৯৭৮ সালের আগে এ অভিযানের কথা কেউ জানত না। ভারতে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এই ব্যর্থ অভিযানের কথা গোপন রাখা হয়েছিল।

সে সময় ওয়াশিংটন পোস্ট এক রিপোর্টে জানায়, সিআইএ কিছু অভিজ্ঞ আমেরিকান পর্বতারোহী ভাড়া করে হিমালয়ের দুটি শৃঙ্গে পারমাণবিক শক্তিচালিত নজরদারির যন্ত্র বসিয়েছিল- যার লক্ষ্য ছিল চীনের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করা।

ওয়াশিংটন পোস্টের সেই রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৬৫ সালে প্রথম অভিযানটি ব্যর্থ হয় এবং যন্ত্রপাতি হারিয়ে যায়। তবে দু বছর পর আরেকটি অভিযানে সিআইএ’র মতে ‘আংশিক সাফল্য’ পাওয়া গিয়েছিল।

এরপর ১৯৬৭ সালে নন্দাদেবীর কাছে নন্দাকোট নামে আরেকটি শৃঙ্গের ওপর নতুন এক সেট গুপ্তচরবৃত্তির যন্ত্রপাতি সফলভাবে বসানো হয়।

এ জন্য ১৪ আমেরিকান পর্বতারোহীকে তিন বছর কাজ করতে হয়। তাদের প্রতি মাসে এক হাজার ডলার দেয়া হয়েছিল।

১৯৭৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই পার্লামেন্টে জানান যে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে নন্দাদেবী শৃঙ্গে পারমাণবিক শক্তিচালিত যন্ত্র বসানোর কাজ করেছে। তবে এ মিশন কতটা সফল হয় তা দেশাই জানাননি।

সে সময় দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের সামনে এর প্রতিবাদে ছোট একটি বিক্ষোভ হয়েছিল বলে সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন গোপন দলিলপত্রে জানা গেছে।

বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘সিআইএ ভারত ছাড়ো’ এবং ‘সিআইএ আমাদের পানি দূষিত করছে’।

তবে এখন পর্যন্ত কেউ জানে না সেই হারানো পারমাণবিক যন্ত্রগুলোর কী হয়েছে। রাইনিতে হিমবাহ ধসের ঘটনার পর সেগুলো আবারও আলোচনায় আসল।

সম্পর্কিত খবর
সব খবর
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | বাংলা৫২নিউজ.কম
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি এবং অপরাধ