বিশ্ব শিশু দিবস আজ /একই বয়স, শৈশব দুই রকম
একই বয়সের দুটি শিশু, অথচ শৈশব দুই রকম। একজনের দিন শুরু হয় স্কুলের পোশাক পরে বই-খাতা গুছিয়ে। অন্যজনের দিন কাটে জীবিকার তাগিদে। একজন বেড়ে ওঠে বই, ইন্টারনেট ও পড়ার অনুকূল পরিবেশে। অন্যজন বেড়ে ওঠে অভাব, অপুষ্টি আর অনিরাপদ পরিবেশে। বৈষম্যের দেয়াল আলাদা করে দেয় তাদের বেড়ে ওঠার পথ।
বাংলাদেশে আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার দিবসটি পালন করা হয়। শিশু অধিকার ও সুরক্ষার নানা দিক সামনে রেখে এবারও দিবসটি উদযাপিত হবে। উদযাপনের পাশাপাশি দেশের সব শিশু কি সমান অধিকার ও সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠছে কিনা– সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
এ বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে শিশুদের জীবনযাত্রার একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। ৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারের নমুনার মধ্যে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবার থেকে সফলভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
জরিপে ১৭৩টি সূচক অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিক্ষায় অগ্রগতি থাকলেও ঝরে পড়ার চিত্রটি উদ্বেগের। প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও নিম্ন মাধ্যমিকে তা ৬০ দশমিক ১ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।
উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বয়সসীমায় ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে। আবার ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের ভিত্তিগত পাঠদক্ষতা এবং ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের ভিত্তিগত সংখ্যাগত দক্ষতা রয়েছে।
একটি বেসরকারি স্কুলে কর্মরত চাকরিজীবী ও অভিভাবক শাহানা জামান নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, বাবা-মা চাকরি করলে সন্তানকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। স্কুলের পড়া, অনলাইন ক্লাস, খাবার ও নিরাপত্তা– সব সামলাতে বাড়তি সহায়তা দরকার হয়। অনেক পরিবার সেই সুযোগ পায় না। ফলে একই শহরে থেকেও শিশুর সুযোগের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
শিশুশ্রমও সেই বৈষম্যের বড় উদাহরণ। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ।
কন্যাশিশুর সামনে এখনও বড় বাধা বাল্যবিবাহ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮.৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। যদিও ২০১৯ সালের তুলনায় বাল্যবিবাহের হার কমেছে, পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক।
শিশুর নিরাপত্তার চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। এক থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনসহ সহিংস শৃঙ্খলার অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ।
পুষ্টির ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বাকৃতির, ১২ দশমিক ৯ শতাংশ দুর্বল ও অতিরিক্ত রোগা এবং ২৩ শতাংশ কম ওজনের। ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য পাচ্ছে।
অভিভাবক এবং জিম ট্রেইনার ফাহমিদা হক বলেন, ‘আমরা দুজনই চাকরি করি। সন্তানের জন্য ভালো খাবার ও ভালো স্কুল নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। শিশুর নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ, সময় দেওয়া এবং সুস্থ পরিবেশও দরকার। কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য এ জায়গাগুলোতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা আরও প্রয়োজন।’
শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশের প্রশ্নেও উদ্বেগ আছে। উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করলেও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। পানির উৎসের ৪৭ দশমিক ১ শতাংশে ই. কোলাই দূষণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮.৪ শতাংশের রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য অগ্রগতি যেমন হয়েছে, তেমনি বৈষম্য ও ঝুঁকিও রয়ে গেছে। কোনো শিশু স্কুলে যাচ্ছে, অন্য শিশু শ্রমে যুক্ত; কেউ পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে, কেউ অপুষ্টিতে আছে; কেউ নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠছে, কেউ সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অগ্রগতির পাশাপাশি এখনও পিছিয়ে রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু, যাদের জন্য প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও সেবার সুযোগ। শিশুতে শিশুতে পারিবারিক বাস্তবতায় পার্থক্য থাকলেও তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিশ্ব শিশু দিবসে শিশুদের অধিকার ও সুযোগের এই বৈষম্য কমানোর বিষয়টিই আলোচনায় রয়েছে।






















নাসীরুদ্দীনের ওপর হামলায় বিএনপির সম্পৃক্ততা নেই: রাশেদ খাঁন