হেফাজতের পৃথক জোট গঠন বিএনপি-জামায়াতে আটকা
হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ধারার সাত দলকে নিয়ে আলাদা জোট গড়ার চেষ্টা চলছে। তবে কিছু শর্তের মধ্যে এটি আটকে আছে। হেফাজত ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চায়– এ জোটের শরিকরা অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটে থাকতে পারবে না। কিন্তু কয়েকটি দল জামায়াতে ইসলামীর জোট ছাড়ার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত। বিএনপির জোট ছাড়া নিয়েও রয়েছে একটি দলের টানাপোড়েন।
বিএনপির নির্বাচনী সঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং ইসলামী ঐক্যজোট চায় জামায়াতকে ছেড়ে আসুক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি। কিন্তু জমিয়ত নিজে বিএনপির জোট ছাড়েনি। অন্য দলগুলো মনে করছে, তারা বিএনপির জোট ছাড়বে না।
অন্যদিকে জামায়াত নতুন এ জোট গঠন প্রক্রিয়াকে সন্দেহের চোখে দেখছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হেফাজতের এই উদ্যোগ মূলত ১১ দলীয় ঐক্য ভাঙার চেষ্টা। এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়েও হেফাজতের জোট গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলোর মতপার্থক্য রয়েছে। সনদ ও গণভোট ইস্যুতে হেফাজতের নিজস্ব অবস্থান নেই। সনদ ও গণভোট বিষয়ে জমিয়তের অবস্থান বিএনপির অনুরূপ। আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিস সনদ ও গণভোটের বাস্তবায়ন চায়।
জামায়াতবিরোধী জোটের চেষ্টা
বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলো নানা ধারায় বিভক্ত। এর মধ্যে নিবন্ধিত দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলন দেওবন্দের মতবাদের অনুসারী। এর মধ্যে চরমোনাইর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বাদে অন্য ছয়টি দল আগে থেকেই হেফাজতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দলগুলোর নেতারা হেফাজতেরও নেতৃত্বে রয়েছেন।
জামায়াত আবুল আলা মওদুদীর মতবাদের অনুসারী। অন্যদিকে, হেফাজত দেওবন্দের অনুসারী। তারা মওদুদীর মতবাদের বিরোধী। গত বছরের এপ্রিলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম এবং জমিয়ত নির্বাচনী মোর্চা গড়তে এক হয়। এতে গত বছরের আগস্টে যুক্ত হয় জামায়াত। জমিয়ত চলে যায় বিএনপির নির্বাচনী জোটে।
দেওবন্দ ও মওদুদীবাদের বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলামসহ সাত দল এক হয়। এতে যুক্ত হয় দেওবন্দি আরেক দল খেলাফত আন্দোলন। তবে আসন বণ্টন নিয়ে বিরোধে চরমোনাইর পীরের দল গত জানুয়ারিতে জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে যায়। থেকে যায় বাংলাদেশ খেলাফত, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন। তারা জামায়াত জোট থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়। হেফাজত পক্ষ নেয় বিএনপির। এমনকি ‘জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম’ বলে ফতোয়া দেন হেফাজতের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
আসন ছাড় না পাওয়া খেলাফত আন্দোলন নির্বাচনের পর জামায়াত জোট ছেড়ে যায়। তবে দলটির একাংশ জোটে রয়েছে। খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার ঘোষণা না দিলেও জামায়াত জোটের কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। ফলে দেওবন্দ ধারার দলগুলোর মধ্যে কার্যত বাংলাদেশ খেলাফত এবং নেজামে ইসলাম এখন পর্যন্ত জামায়াত জোটে আছে।
এ দলগুলোকেও জামায়াত জোট থেকে বের করে আনতে গত এপ্রিলে তৎপরতা শুরু করে হেফাজত। হয় হেফাজত, নয়তো জামায়াত জোট– এই শর্ত দেওয়া হয়। তবে দলগুলো তা মানেনি। এরপর শুরু হয় হেফাজতের উদ্যোগে কওমি ধারার ৭ দলকে নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতের বাইরে পৃথক জোট গড়ার চেষ্টা।
গত ১৬ জুলাই প্রথম বৈঠকের পর দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রস্তাব দিতে বলা হয়। তা তারা হেফাজতকে দেয় গত মাসের শেষ অর্ধে। তা সমন্বয় করে গত রোববার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় ৭ দলের বৈঠকে হেফাজত রূপরেখা তুলে ধরে।
মতবিরোধ
চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১২ দফা প্রস্তাব দেয়। এতে ছিল, দেওবন্দের মতবাদ অনুসরণকারী নিবন্ধিত সাতটি দলের ঐক্য হবে। যেসব দল এই ঐক্যে থাকবে তারা অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটে থাকতে পারবে না। ঐক্যের নেতৃস্থানীয় কেউ অন্য কোনো দলকে সমর্থন দিতে পারবেন না।
খেলাফত আন্দোলন ও ইসলামী ঐক্যজোট দিয়েছিল আকিদার শর্ত। মওদুদীর মতবাদের অনুসরণ করা জামায়াত থেকে ঐক্যের শরিকদের দূরে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসলামী ঐক্যজোট। খেলাফত আন্দোলনের প্রস্তাব ছিল শুধু দেওবন্দের মতবাদ অনুসারী সাতটি দলের ঐক্য হবে।
গত নির্বাচনে বিএনপির ছেড়ে দেওয়া চারটি আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হন জমিয়তের প্রার্থীরা। এ নিয়ে নির্বাচনের পর থেকেই ক্ষোভ জানাচ্ছেন জমিয়ত নেতারা। দলটির অপরাংশ বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনে হেরে গেছে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েও। জমিয়তের আট দফা প্রস্তাবের প্রথমটিই ছিল– ৭ দলের কেউ জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না।
বাংলাদেশ খেলাফত, খেলাফত মজলিস এবং নেজামে ইসলামের প্রস্তাব ছিল, অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট রাখা যাবে না, এমন শর্ত দেওয়া যাবে না। তাদের প্রস্তাবের সারাংশ হলো, ৭ দলের ঐক্য হবে আদর্শিক। রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়ে দলগুলো স্বাধীন থাকবে। খেলাফত মজলিসের প্রস্তাব ছিল, আদর্শিক ঐক্যে আপত্তি নেই। রাজনৈতিক ঐক্য হতে হলে সব দলকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে থাকতে হবে।
৭ দলের পরস্পরবিরোধী এসব প্রস্তাব সমন্বয় করে হেফাজত নেতারা ঐক্যের রূপরেখা তৈরি করেন। যা তোলা হয় গত রোববারের বৈঠকে। কিন্তু এতে ঐকমত্য হয়নি। প্রত্যেক দল থেকে তিনজন করে এবং হেফাজত থেকে তিনজন নেতাকে নিয়ে ২৪ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই কমিটি ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত তৈরি করবে। হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমানকে এই লিয়াজোঁ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। আগামী ২২ অক্টোবর কমিটির প্রথম বৈঠক হবে ঢাকায়।
৭ দলীয় ঐক্য হলে আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব কে হবেন, কীভাবে নেতৃত্ব নির্বাচিত এবং পরিবর্তন হবে– এ নিয়ে ঐকমত্য হয়নি। বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, জমিয়ত আগে থেকেই শর্ত দিয়ে রেখেছে অন্যরা জামায়াত না ছাড়লে তারা বিএনপির জোট ছাড়বে না।
বৈঠকে অংশ নেওয়া ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান সমকালকে বলেছেন, ৭ দল যদি ঐক্য করে, তাহলে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটে থাকা সমীচীন হবে না।
সাতদলীয় ঐক্য কি রাজনৈতিক নাকি আদর্শিক হবে– এই প্রশ্নে গাজী আতাউর বলেন, ইসলামপন্থি দলগুলোর শক্তিকে সুসংহত করতে এই ঐক্য করা হচ্ছে, যাতে ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করা যায়। তাই শুধু আদর্শিক নয়; রাজনৈতিক হবে এই জোট। ঐক্যের শরিকরা অন্য জোটে থাকতে পারবেন না। এই ঐক্য হবে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন সমকালকে বলেন, আগে রূপরেখা ঠিক হোক। তখনই বলা যাবে, ঐক্যের কোনো শরিক অন্য কোনো জোটে থাকতে পারবে কিনা।
নেতৃত্ব ও উদ্দেশ্য নিয়েও বিরোধ
জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইসলামী আন্দোলন গত নির্বাচনে এককভাবে ২৫৭ আসনে অংশ নিয়ে একটিতে জয় পেয়েছে। বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি দলের মহাসচিব সমকালকে বলেছেন, ঐক্যের নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে ইসলামী আন্দোলন।
২০১৩ সালেও জামায়াত বাদে অন্যান্য ইসলামী দলকে নিয়ে জোট করতে তৎপর হয়েছিল হেফাজত। তাতে সাড়া দিয়েও পরে আর হেফাজতের সঙ্গে থাকেনি ইসলামী আন্দোলন। বিএনপির সেই সময়কার জোট শরিক ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, জমিয়ত ছিল হেফাজতের সঙ্গেও। ২০১৭ সালে বিএনপি জোট ছাড়ে ইসলামী ঐক্যজোট। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সহযোগিতা চেয়েছিল দলটি। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও অংশ নেয়। তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দলটির নেতৃত্বে পরিবর্তন রয়েছে।
২০২১ সালে হেফাজতের ডাকে নরেন্দ্র মোদিবিরোধী আন্দোলনের মামলায় শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিএনপির জোট ছেড়ে দেয় জমিয়ত ও খেলাফত মজলিস। হেফাজতের তৎকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতাদের প্রায়ই বৈঠক হতো।
গত রোববারের বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন নেতা সমকালকে বলেছেন, অতীতের মতো হেফাজতের ওপর সরকারি প্রভাবের লক্ষণ দেখা গেছে খসড়া রূপরেখায়। শুধু জামায়াত নয়; বিএনপির সঙ্গেও জোট রাখা যাবে না– এমন শর্ত থাকলে ভারসাম্যপূর্ণ হতো।
জমিয়ত সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক সমকালকে বলেছেন, ‘সাতদলীয় ঐক্য হলে কোনো শরিক ঐক্যের বাইরে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোটে থাকতে পারবে না।’ এ ক্ষেত্রে জমিয়ত বিএনপিকে ছাড়বে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অন্যরা জামায়াত ছাড়লে জমিয়তও বিএনপিকে ছাড়বে।’
জানতে চাইলে জমিয়তের মহাসচিব মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী সমকালকে বলেন, অন্যান্য দল যদি জামায়াত জোট ছাড়ে, তবে জমিয়ত বিএনপির জোট ছাড়ার বিষয়টি ভাববে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেছেন, ‘সাতদলীয় ঐক্য যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে আমাদের প্রস্তাব হলো জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে থাকতে হবে।’
জামায়াতের একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, তাদের কাছে খবর হলো, হেফাজতের মাধ্যমে ১১ দলীয় ঐক্য ভাঙার চেষ্টা করছে বিএনপি। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেছেন, জুলাই সনদ ও গণভোট প্রশ্নে ১১ দল অটুট রয়েছে। যেসব দল জনগণের কাছে গণভোট অনুযায়ী সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, তারা ১১ দলেই থাকবে।
হেফাজতের মহাসচিব ও লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান মাওলানা সাজিদুর রহমান সমকালকে বলেন, বিভক্ত ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কাজটি করা হচ্ছে।
ঐক্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের নীতি-আদর্শ অনুসরণ এবং শরিয়াবিরোধী কোনো রাজনীতি ও জোটে জড়িত না হওয়াই ঐকমত্যের মূল ভিত্তি। দলগুলোর মধ্যে ঐক্য হয়ে গেলে রাজনীতিতে হেফাজতের আরও বড় প্রভাব তৈরি হবে। দাবি-দাওয়া আদায়ও সহজ হবে।’






















খামারবাড়িতে ডিএইর তিন কর্মকর্তাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে পোস্টার