দুর্গাপূজার ছুটিতে সড়কে বাড়তি ঝুঁকি, সেপ্টেম্বরে ৪২৩ প্রাণহানি
নিজস্ব প্রতিবেদক : শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে ঘরমুখী মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ, গণপরিবহনের শৃঙ্খলা নিশ্চিত এবং মহাসড়কে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। একই সঙ্গে সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু।
সংগঠনটির তথ্য পর্যবেক্ষণ সেলের প্রস্তুত করা সেপ্টেম্বর মাসের দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন এবং দুর্গাপূজার ছুটিতে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রস্তাবনায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ১২টি জাতীয় দৈনিক, ২২টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫৬টি ছিল মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৯ জন। এ ছাড়া ১০৬ জন পথচারী এবং ৫৩ জন চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেল ছিল ১৬২টি, থ্রি-হুইলার ১২৯টি এবং বাস ১১৩টি। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে, ১০৯টি পথচারীকে ধাক্কা বা চাপা দেওয়ায়, ৯৮টি মুখোমুখি বা একাধিক যানবাহনের সংঘর্ষে এবং ৬১টি পেছন থেকে ধাক্কার কারণে।
সড়কের ধরন অনুযায়ী, ১৭৮টি দুর্ঘটনা আঞ্চলিক সড়কে, ৬৩টি শহরের সড়কে এবং ৫৬টি গ্রামীণ সড়কে ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে—২০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২১ জনের। একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সর্বাধিক ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত ও চারজন নিখোঁজ হন। পাশাপাশি ২৩টি ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের প্রশিক্ষণ ও শারীরিক-মানসিক সক্ষমতার ঘাটতি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতনের অভাব, মহাসড়কে অপর্যাপ্ত সার্ভিস লেন, ধীরগতির যানবাহনের চলাচল এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তদারকির ঘাটতি।
তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অসচেতনতাকেও ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংগঠনটি। দুর্গাপূজার ছুটিতে যাত্রীদের নিরাপত্তায় ছয় দফা প্রস্তাব আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনা ও যাত্রী হয়রানি কমাতে সংগঠনটি ছয়টি ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমত, মহাসড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা ও স্পিড গান ব্যবহার করে যানবাহনের গতি পর্যবেক্ষণ, ই-প্রসিকিউশন চালু এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
একই সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষায় স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বা ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করে বিপজ্জনক বাঁক সংস্কার, সড়ক বিভাজক ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও জেব্রা ক্রসিং নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তৃতীয়ত, চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, ডোপ টেস্ট, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দূরপাল্লার যানবাহনে বিকল্প চালক রাখার পাশাপাশি চালক ও সহকারীদের নিয়োগপত্র এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী উভয়ের জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার এবং গতিসীমা মেনে চলা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে। মহাসড়কে ধীরগতির ও অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে বিকল্প স্থানীয় সড়কের ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও রয়েছে। পঞ্চমত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সড়ক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানো এবং মহাসড়কের নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর উদ্ধারকারী দল, অ্যাম্বুলেন্স ও কার্যকর ট্রমা সেন্টার রাখার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
ষষ্ঠত, অবৈধ হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার বন্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজানো নিয়ন্ত্রণের দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির মতে, শব্দদূষণ কমানো ও চালকদের মনোযোগ ধরে রাখাও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যাত্রীদের প্রতিও আহ্বান দুর্গাপূজার ছুটিতে যাত্রীদের অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালালে প্রতিবাদ করা, মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহার, নির্ধারিত স্থান দিয়ে সড়ক পারাপার এবং ভ্রমণের আগে বাসাবাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সংগঠনটি গণমাধ্যমের প্রতি বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, গণপরিবহনের সংকট ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, ঈদের মতো বড় ছুটির সময়ের মতো দুর্গাপূজার ছুটিতেও বাড়তি যাত্রীচাপ সামাল দিতে সমন্বিত তদারকি জরুরি। যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি কামারুন নাহার, সাধারণ সম্পাদক সায়মুন নাহার জিদনী, সাংগঠনিক সম্পাদক যুবায়ের সিকদার, অর্থ সম্পাদক আবুল বাশার হাওলাদার এবং উপদেষ্টা গোলাম ফারুক ও মো. আজাদুর রহমান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন।
সংগঠনটির সাংগঠনিক সম্পাদক যুবায়ের সিকদার জানান, যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতেই এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে উৎসবের ছুটিতে কোনো পরিবারকে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোর শোক বহন করতে না হয়।






















বিএনপি এক ছাতার নিচে সকল ধর্মালম্বী মানুষের বসবাস শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে কাজ করছে – স্বাস্থ্য মন্ত্রী