ঢাকা , বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গোৎসব শেষ, মর্ত্যলোক ছেড়ে গেলেন দেবী

শেষ হলো বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বুধবার বিদায় দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে। সেই সঙ্গে আসছে বছর আবারও মর্ত্যলোকে ফিরে আসবেন মা– এই প্রার্থনা জানান ভক্তরা।

সকাল থেকে ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনির সঙ্গে মিশে ছিল বিদায়ের বিষাদ। দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার পর শেষবারের মতো তাঁর চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রার্থনায় মগ্ন হন ভক্তরা। এর পর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। নাচে-গানে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করলেও মণ্ডপ ছেড়ে যাওয়ার সময় অনেকের চোখেমুখে ছিল বিষণ্নতা। দেবী বিসর্জনের দিনটিতে বিষাদের পাশাপাশি উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল সারাদেশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে উৎসবে যোগ দেন অন্যান্য ধর্মের মানুষও।

এবার ঢাকা মহানগরীর ২৫৮টিসহ সারাদেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব হয়েছে।। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ-কল্যাণ ও সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরন্তর শান্তি-সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গত শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উৎসব। তবে এবার সপ্তমী তিথি দুই দিন পড়ায় প্রচলিত পাঁচ দিনের চেয়ে এক দিন বেড়ে ছয় দিন ধরে শারদীয় দুর্গাপূজা চলেছে। এই হিসাবে শনিবার মহাসপ্তমী ও রোববার মহাসপ্তমী (অধিক পূজা) উদযাপন হয়। এর পর সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমী শেষে বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের মিলনমেলা ভাঙল।

সনাতন বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে স্বর্গালোক থেকে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) এসেছিলেন (আগমন)। যার ফল হচ্ছে ‘ফসল ও শস্যহানি’। আর দেবী স্বর্গালোকে বিদায় (গমন) নিয়েছেন নৌকায় চড়ে। এর ফল ‘শস্যবৃদ্ধি’।

প্রতিমা বিসর্জনের আগে দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা চলে। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় দশমী বিহিত পূজা। এর পর দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। চলে ভক্তদের আরতি আর রঙের হোলি খেলা। পরম ভক্তি নিয়ে নিজ নিজ মনের বাসনা জানিয়ে দেবীর পায়ে সিঁদুর ছোঁয়ান নারীরা। বিসর্জনের জন্য সধবা নারীরা দেবীকে সাজান ফুল, সিঁদুর ও নানা অলংকার দিয়ে। পুরোহিতরা দেবীর জন্য সাজান সেদ্ধ চালের নৈবেদ্য, কচু-ঘেচু, শাপলা দিয়ে। এর পর শেষ মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয় দেবীকে।

দশমীর সকালে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ছিল ভক্তদের ভিড়। বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপ, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ও রমনা কালী মন্দিরে দিনভর চলে দেবী বরণ, সিঁদুর খেলা ও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। সকাল থেকে বনানীর পূজামণ্ডপে বরণডালায় সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি নিয়ে দেবীকে বিদায় জানাতে জড়ো হন নারীরা। একে একে দেবীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে ও মিষ্টি নিবেদন করে তাঁকে বরণ করেন তারা। এর পর পরস্পরের কপালে ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে মেতে ওঠেন আনন্দে। ঢাকের বাদ্যি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মণ্ডপ।

একই চিত্র দেখা যায় রমনা কালী মন্দিরে। সকাল থেকে ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল মন্দির প্রাঙ্গণ। একদিকে চলছিল দেবীর পায়ে শেষ অঞ্জলি নিবেদন ও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে ঢাকের তালে নাচে-গানে মেতে ওঠেন তরুণ-তরুণীরা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদেরও দেখা যায় উৎসবে অংশ নিতে। সিঁদুর খেলা ঘিরে ছিল পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও মিষ্টিমুখের আয়োজন।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেও সকাল থেকে ছিল ভক্তদের সমাগম। মন্দিরের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পরে দেবী বরণ ও সিঁদুর খেলায় অংশ নেন নারীরা। লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীদের সিঁদুর মাখামাখি, ঢাকের বাদ্যি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ।

এদিকে সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মন্দিরে ভিড় করেন ভক্তরা। নারীরা বরণের থালায় সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি নিয়ে একে একে দেবীর সামনে হাজির হন। দেবীর মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে ও চরণে সিঁদুর নিবেদন করে শুরু হয় বরণের আনুষ্ঠানিকতা। এর পর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন নারীরা।

সিঁদুর খেলা শেষে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের মধ্যে চলে শুভেচ্ছা বিনিময়। ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে। মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে একে অপরকে জানান বিজয়ার শুভেচ্ছা। উৎসবের এই আনন্দঘন মুহূর্তেও দেবীকে বিদায় দেওয়ার বেদনা অনুভব করেন সবাই।

দুপুরের পর শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে পূজারিরা ট্রাক ও ঠেলাগাড়িতে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে। সেখানে ভক্তদের নাচ-গানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তারা রং ছিটিয়ে, ঢাকঢোলসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি উলুধ্বনিতে পরিবেশ উৎসবমুখর করে তোলে।

বন্ধুদের সঙ্গে নাচে-গানে অংশ নেওয়া তরুণ সৌমিক মজুমদার বলেন, ‘বিদায়ের সময় মন খারাপ হয়। কিন্তু মা আবার আসবেন– এই বিশ্বাস আমাদের আনন্দ দেয়। আসছে বছর আবার দেখব মাকে– এই প্রত্যাশা নিয়েই বিদায়ের মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখি।’

বিকেল ৪টার দিকে ঢাকেশ্বরীর পূজামণ্ডপ থেকে রাজঘট ও নবপত্রিকা (কলাবউ) আনার পর একযোগে শুরু হয় শোভাযাত্রা। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটিসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় ট্রাকবাহী প্রতিমাসহ বিচিত্র সাজ পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও যুবরা হেঁটে ও বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে যোগ দেন। অনেকেই দুর্গা, শিব, মহিষাসুরসহ পৌরাণিক চরিত্রের নানা সাজে অংশ নেন। যাত্রাপথে রাস্তার দুপাশে এবং আশপাশের ভবনের ছাদ-বারান্দায় দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানান।

শোভাযাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পেরিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মাজার, রেলওয়ে হাসপাতাল, নগর ভবন, গোলাপ শাহ মাজার, গুলিস্তান, নবাবপুর রোড ও বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে পৌঁছায়। সেখানে প্রতিমা বহনকারী নৌকাগুলো মাঝনদীতে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে। বিসর্জনের এই পর্ব চলেছে রাত পর্যন্ত। শেষে শান্তিজল গ্রহণ এবং হিন্দুদের ঘরে ঘরে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মিষ্টি বিতরণ হয়েছে।

বিজয়া দশমীকে ঘিরে রাজধানীতে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিপুল সংখ্যক পুলিশ-বিজিবি সদস্যের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয় এসআরবি ও গোয়েন্দা সদস্যদের। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ছিল ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রার দুপাশসহ ওয়াইজঘাট পর্যন্ত। দুপুর থেকেই পলাশীর মোড়ের চারপাশে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সাগরে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবনী পয়েন্টে সাগরে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দিয়েছেন লাখো ভক্ত। বিপুলসংখ্যক পর্যটক বালুচরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করেন।

বিসর্জনের আগে বিকেল ৪টায় বিজয়ামঞ্চে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান হয়। সেখানে বক্তব্য দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দীন, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু জানান, কক্সবাজারের এবার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি প্রতিমা পূজা এবং ১৬৯টি ঘটপূজা। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বুধবার বিকেল থেকে কক্সবাজার সৈকতে অন্তত ৪০০ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, বুধবার দুপুরের পর থেকে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। আশপাশের অনেক এলাকা থেকেও ট্রাক, মিনি ট্রাকসহ নানা যানবাহনে করে একে একে দুর্গা প্রতিমা নিয়ে আসতে থাকেন ভক্তরা। পরে একে একে প্রতিটি প্রতিমাকে দেওয়া হয় বিসর্জন।

পতেঙ্গা সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। যাবতীয় বিষয় তদারকি করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পূজা কমিটির তথ্যমতে, এবার চট্টগ্রামে দুই হাজার ২৭৪টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ট্যাগ :

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ১২:২৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
৫০০ Time View

দুর্গোৎসব শেষ, মর্ত্যলোক ছেড়ে গেলেন দেবী

আপডেটের সময় : ১২:২৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

শেষ হলো বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বুধবার বিদায় দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে। সেই সঙ্গে আসছে বছর আবারও মর্ত্যলোকে ফিরে আসবেন মা– এই প্রার্থনা জানান ভক্তরা।

সকাল থেকে ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনির সঙ্গে মিশে ছিল বিদায়ের বিষাদ। দেবী দুর্গাকে বরণ করে নেওয়ার পর শেষবারের মতো তাঁর চরণে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রার্থনায় মগ্ন হন ভক্তরা। এর পর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। নাচে-গানে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করলেও মণ্ডপ ছেড়ে যাওয়ার সময় অনেকের চোখেমুখে ছিল বিষণ্নতা। দেবী বিসর্জনের দিনটিতে বিষাদের পাশাপাশি উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল সারাদেশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে উৎসবে যোগ দেন অন্যান্য ধর্মের মানুষও।

এবার ঢাকা মহানগরীর ২৫৮টিসহ সারাদেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব হয়েছে।। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ-কল্যাণ ও সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরন্তর শান্তি-সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গত শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উৎসব। তবে এবার সপ্তমী তিথি দুই দিন পড়ায় প্রচলিত পাঁচ দিনের চেয়ে এক দিন বেড়ে ছয় দিন ধরে শারদীয় দুর্গাপূজা চলেছে। এই হিসাবে শনিবার মহাসপ্তমী ও রোববার মহাসপ্তমী (অধিক পূজা) উদযাপন হয়। এর পর সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা এবং মঙ্গলবার মহানবমী শেষে বুধবার বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ছয় দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের মিলনমেলা ভাঙল।

সনাতন বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে স্বর্গালোক থেকে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) এসেছিলেন (আগমন)। যার ফল হচ্ছে ‘ফসল ও শস্যহানি’। আর দেবী স্বর্গালোকে বিদায় (গমন) নিয়েছেন নৌকায় চড়ে। এর ফল ‘শস্যবৃদ্ধি’।

প্রতিমা বিসর্জনের আগে দিনব্যাপী পূজা-অর্চনা চলে। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় দশমী বিহিত পূজা। এর পর দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। চলে ভক্তদের আরতি আর রঙের হোলি খেলা। পরম ভক্তি নিয়ে নিজ নিজ মনের বাসনা জানিয়ে দেবীর পায়ে সিঁদুর ছোঁয়ান নারীরা। বিসর্জনের জন্য সধবা নারীরা দেবীকে সাজান ফুল, সিঁদুর ও নানা অলংকার দিয়ে। পুরোহিতরা দেবীর জন্য সাজান সেদ্ধ চালের নৈবেদ্য, কচু-ঘেচু, শাপলা দিয়ে। এর পর শেষ মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে বিদায় জানানো হয় দেবীকে।

দশমীর সকালে রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ছিল ভক্তদের ভিড়। বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপ, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির ও রমনা কালী মন্দিরে দিনভর চলে দেবী বরণ, সিঁদুর খেলা ও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা। সকাল থেকে বনানীর পূজামণ্ডপে বরণডালায় সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি নিয়ে দেবীকে বিদায় জানাতে জড়ো হন নারীরা। একে একে দেবীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে ও মিষ্টি নিবেদন করে তাঁকে বরণ করেন তারা। এর পর পরস্পরের কপালে ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে মেতে ওঠেন আনন্দে। ঢাকের বাদ্যি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মণ্ডপ।

একই চিত্র দেখা যায় রমনা কালী মন্দিরে। সকাল থেকে ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল মন্দির প্রাঙ্গণ। একদিকে চলছিল দেবীর পায়ে শেষ অঞ্জলি নিবেদন ও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে ঢাকের তালে নাচে-গানে মেতে ওঠেন তরুণ-তরুণীরা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদেরও দেখা যায় উৎসবে অংশ নিতে। সিঁদুর খেলা ঘিরে ছিল পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও মিষ্টিমুখের আয়োজন।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেও সকাল থেকে ছিল ভক্তদের সমাগম। মন্দিরের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পরে দেবী বরণ ও সিঁদুর খেলায় অংশ নেন নারীরা। লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীদের সিঁদুর মাখামাখি, ঢাকের বাদ্যি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ।

এদিকে সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল মন্দিরে ভিড় করেন ভক্তরা। নারীরা বরণের থালায় সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি নিয়ে একে একে দেবীর সামনে হাজির হন। দেবীর মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে ও চরণে সিঁদুর নিবেদন করে শুরু হয় বরণের আনুষ্ঠানিকতা। এর পর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন নারীরা।

সিঁদুর খেলা শেষে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের মধ্যে চলে শুভেচ্ছা বিনিময়। ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে। মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে একে অপরকে জানান বিজয়ার শুভেচ্ছা। উৎসবের এই আনন্দঘন মুহূর্তেও দেবীকে বিদায় দেওয়ার বেদনা অনুভব করেন সবাই।

দুপুরের পর শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে পূজারিরা ট্রাক ও ঠেলাগাড়িতে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে। সেখানে ভক্তদের নাচ-গানে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তারা রং ছিটিয়ে, ঢাকঢোলসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি উলুধ্বনিতে পরিবেশ উৎসবমুখর করে তোলে।

বন্ধুদের সঙ্গে নাচে-গানে অংশ নেওয়া তরুণ সৌমিক মজুমদার বলেন, ‘বিদায়ের সময় মন খারাপ হয়। কিন্তু মা আবার আসবেন– এই বিশ্বাস আমাদের আনন্দ দেয়। আসছে বছর আবার দেখব মাকে– এই প্রত্যাশা নিয়েই বিদায়ের মুহূর্তটাকে স্মরণীয় করে রাখি।’

বিকেল ৪টার দিকে ঢাকেশ্বরীর পূজামণ্ডপ থেকে রাজঘট ও নবপত্রিকা (কলাবউ) আনার পর একযোগে শুরু হয় শোভাযাত্রা। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটিসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের নেতৃত্বে শোভাযাত্রায় ট্রাকবাহী প্রতিমাসহ বিচিত্র সাজ পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও যুবরা হেঁটে ও বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে যোগ দেন। অনেকেই দুর্গা, শিব, মহিষাসুরসহ পৌরাণিক চরিত্রের নানা সাজে অংশ নেন। যাত্রাপথে রাস্তার দুপাশে এবং আশপাশের ভবনের ছাদ-বারান্দায় দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানান।

শোভাযাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পেরিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মাজার, রেলওয়ে হাসপাতাল, নগর ভবন, গোলাপ শাহ মাজার, গুলিস্তান, নবাবপুর রোড ও বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে পৌঁছায়। সেখানে প্রতিমা বহনকারী নৌকাগুলো মাঝনদীতে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয় দেবী দুর্গাকে। বিসর্জনের এই পর্ব চলেছে রাত পর্যন্ত। শেষে শান্তিজল গ্রহণ এবং হিন্দুদের ঘরে ঘরে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মিষ্টি বিতরণ হয়েছে।

বিজয়া দশমীকে ঘিরে রাজধানীতে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিপুল সংখ্যক পুলিশ-বিজিবি সদস্যের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয় এসআরবি ও গোয়েন্দা সদস্যদের। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ছিল ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রার দুপাশসহ ওয়াইজঘাট পর্যন্ত। দুপুর থেকেই পলাশীর মোড়ের চারপাশে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সাগরে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবনী পয়েন্টে সাগরে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দিয়েছেন লাখো ভক্ত। বিপুলসংখ্যক পর্যটক বালুচরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করেন।

বিসর্জনের আগে বিকেল ৪টায় বিজয়ামঞ্চে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান হয়। সেখানে বক্তব্য দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দীন, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু জানান, কক্সবাজারের এবার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি প্রতিমা পূজা এবং ১৬৯টি ঘটপূজা। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বুধবার বিকেল থেকে কক্সবাজার সৈকতে অন্তত ৪০০ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, বুধবার দুপুরের পর থেকে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা বিসর্জন শুরু হয়। আশপাশের অনেক এলাকা থেকেও ট্রাক, মিনি ট্রাকসহ নানা যানবাহনে করে একে একে দুর্গা প্রতিমা নিয়ে আসতে থাকেন ভক্তরা। পরে একে একে প্রতিটি প্রতিমাকে দেওয়া হয় বিসর্জন।

পতেঙ্গা সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। যাবতীয় বিষয় তদারকি করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পূজা কমিটির তথ্যমতে, এবার চট্টগ্রামে দুই হাজার ২৭৪টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।