নরসিংদীতে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে সাংবাদিক বাবুলসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা
মোঃ মোবারক হোসেন
নরসিংদী প্রতিনিধি:
নরসিংদীর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে জিম্মি রেখে মারধর এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিত মাসুদ রানা বাবুলকে প্রধান আসামি করে ৭ জনের বিরুদ্ধে নরসিংদী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী লিখন তালুকদার।
তবে মামলার পরও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। অভিযোগের পর থেকেই অভিযুক্তরা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী লিখন তালুকদার ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ঢাকায় একটি কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনা করেন।
মামলার আসামিরা হলেন নরসিংদী সদর উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামের সামাদ সরকারের ছেলে মাসুদ রানা বাবুল ওরফে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বাবুল (৫৫), তার ভাই কামাল সরকার (৪৯), বদরপুর গ্রামের কামাল ভূইয়া (৪৭), নরসিংদী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক আবু হানিফ সজিব (৩৮), বিলাসদী এলাকার ইনসান (৪০) ও শরীফ (৩৮) এবং শিবপুর উপজেলার পুটিয়া গ্রামের মোশারফ হোসেন (৪৯)।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বুধবার দুপুরে একটি চেক সংক্রান্ত মামলায় হাজিরা দিতে নরসিংদী আদালতে আসেন লিখন তালুকদার ও তার বন্ধু শাকিল খান। আদালত থেকে বের হওয়ার সময় মাসুদ রানা বাবুলের নেতৃত্বে কয়েকজন তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখে।
সেখানে তাকে মারধর করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার মোবাইল ফোন থেকে স্ত্রী সায়মা শাহীন রিয়াকে কল করে নির্যাতনের শব্দ শোনানো হয় এবং টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামীকে রক্ষার জন্য সায়মা শাহীন রিয়া অভিযুক্তদের দেওয়া ছয়টি বিকাশ নম্বরে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা পাঠান। এর মধ্যে পাঁচটি নম্বরে ২০ হাজার টাকা করে এবং একটি নম্বরে ১৮ হাজার টাকা পাঠানো হয়। টাকা পাওয়ার পর অভিযুক্তরা লিখনকে ছেড়ে দেয় এবং বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
মুক্তি পাওয়ার পর লিখন নরসিংদী সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় অভিযুক্তদের পরিচয় নিশ্চিত করে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রধান আসামি মাসুদ রানা বাবুল দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নামে পেজ ও আইডি পরিচালনা করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আইনজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করে আসছেন।
তার বিরুদ্ধে নরসিংদীর বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, অপহরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া তিনি নিজেকে ‘মাদকবিরোধী আন্দোলন’ নরসিংদী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, অনুমোদনহীন ওই সংগঠনের নাম ব্যবহার করে তিনি কথিত মাদক কারবারিদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায় করতেন।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে তার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্র সক্রিয় রয়েছে। চক্রের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে ভিডিও ধারণ বা স্ক্রিনশট সংগ্রহ করে পরে সেগুলো প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করতেন।
টাকা না দিলে পরিচালিত ফেসবুক পেজে মানহানিকর প্রচারণা চালানোর অভিযোগও রয়েছে। এমনকি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা আদায়ের একটি ভিডিওচিত্রও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযুক্ত মাসুদ রানা বাবুলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ আর এম আল মামুন বলেন, “ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার তদন্তে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।”
নরসিংদীর পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




















