জন্মনিয়ন্ত্রণে দরকার তরুণ প্রজন্মের সচেতনতা
প্রতিবছর ২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। এ বছর দিবসটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, কয়েক দশকের ধারাবাহিক অগ্রগতির পর দেশের মোট প্রজনন হার আবার ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। এই বাস্তবতায় জন্মনিরোধকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে; বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম যখন শুরু হয়, তখন গর্ভনিরোধক পদ্ধতির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সীমিত। মানুষকে গর্ভনিরোধের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা অতিক্রম করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। রেডিও, মুদ্রিত গণমাধ্যম ও গ্রামাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মতো বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে সে সময় পরিবার পরিকল্পনার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
এই দীর্ঘ যাত্রায় এসএমসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। গত ৫০ বছরে কনডম ও পিল থেকে শুরু করে ইনজেকটেবল, ইমপ্লান্ট ও আইইউডিসহ বিভিন্ন পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সহজলভ্য করার পাশাপাশি সচেতনতা ও চাহিদা তৈরিতে কাজ করেছে। সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন ও যোগাযোগের ধরন পরিবর্তিত হওয়ায় এসএমসির কাজের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়েছে। পণ্য ও সেবার সহজলভ্যতার পাশাপাশি আচরণ পরিবর্তন, জনসচেতনতা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং তরুণদের উপযোগী তথ্য দেওয়ার ওপর গুরুত্ব বেড়েছে।
তরুণদের জন্য জন্মনিরোধ পদ্ধতির ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কারণে। বাংলাদেশে ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৫০ শতাংশ ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। অল্প বয়সে বিয়ে হলে অল্প বয়সেই সন্তান নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ ছাড়া কিশোরী বয়সে সন্তান জন্মদানের হার বৃদ্ধির বিষয়টিও উদ্বেগজনক। কারণ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ মা ও শিশুর জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনার অপূর্ণ চাহিদা তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ সন্তান নেওয়া বা গর্ভধারণ এড়ানোর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকে প্রয়োজনীয় জন্মনিরোধ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারছেন না। অল্প বয়সে গর্ভধারণ একজন তরুণীর শিক্ষা, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জন্মনিরোধকের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। অনেক বছর ধরে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির প্রচার ও প্রচারণা তরুণ প্রজন্মকে খুব একটা আকৃষ্ট করতে পারেনি। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বার্তা পৌঁছাতে হলে তরুণদের উপযোগী করে তা প্রচার করতে হবে। সেই ভাষা আয়ত্ত করতে হলে জানতে হবে তরুণ-তরুণীদের জীবনধারা, রুচিবোধ ও সমস্যাগুলো সম্পর্কে।
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ‘লাইফস্টাইলের’ ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী। কিন্তু জন্মনিরোধকের ব্যবহার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাবে বললেই তারা সে ব্যাপারে আগ্রহী নাও হতে পারে। বরং এটি কীভাবে তাদের শিক্ষা, ক্যারিয়ার ও সম্পর্ককে সুরক্ষিত রাখবে– সে সম্পর্কে কথা বললে তারা এটি ব্যবহারে আগ্রহী হবে।
জন্মনিরোধক সক্ষম দম্পতি তথা তরুণ প্রজন্ম সবার জন্য প্রযোজ্য– এ সম্পর্কেও দিতে হবে স্পষ্ট ধারণা। কারণ বর্তমান প্রজন্ম সম্পর্কের ব্যাপারে অনেক সংকোচহীন ও খোলামেলা।
তরুণ প্রজন্মকে বিভিন্ন জন্মনিরোধক পদ্ধতি, কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, প্রচলিত ভুল ধারণা এবং নির্ভরযোগ্য সেবা কোথায় পাওয়া যাবে– এসব বিষয়ে সঠিক তথ্য জানানো এখন সময়ের দাবি। এতে তারা বন্ধু, সামাজিক মাধ্যম বা অনির্ভরযোগ্য উৎসের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তরুণ প্রজন্মের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক মাধ্যম ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও কনটেন্ট সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। কারণ আজকের তরুণ-তরুণীরা তথ্যের জন্য মূলত এসবের দিকেই ঝোঁকে।
পাশাপাশি, সেবা হতে হবে সহজলভ্য এবং সংকোচহীন। অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় ফার্মেসি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে তরুণদের কাছে মানসম্মত পণ্য ও সঠিক পরামর্শ পৌঁছে দিতে হবে। স্কুল ও কলেজভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মসূচিতেও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক সঠিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন; যাতে ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার দূর হয়।
একইসঙ্গে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও এসএমসির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করতে হবে। মানসম্মত পণ্যের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সেবা পৌঁছে দিতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৫০ বছর আগে দেশে জন্মনিরোধের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই পথ পরিক্রমায় আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কিন্তু আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হলে আমাদের বেছে নিতে হবে যোগাযোগের নানা আধুনিক উপায়। বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, প্রতিটি তরুণ-তরুণী ও দম্পতি যেন সঠিক তথ্য, নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়। কারণ পরিবার পরিকল্পনা শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের স্বাস্থ্য, মর্যাদা, শিক্ষা, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনায় যে অগ্রগতি ও সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তা সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে এসএমসি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতিফলন। আমরা চাই, এ অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী ও অব্যাহত থাকুক; যাতে সবার জন্য পরিবার পরিকল্পনার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়।


























টানা ২ দফা বাড়ার পর দেশের বাজারে কমলো স্বর্ণের দাম