ঢাকা , রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
রবিউস সানি মাসের চাঁদ দেখা গেছে, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম ২৩ সেপ্টেম্বর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ইলিশ চায় ভারত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান বিএনপি সরকারের ৬ মাসে খাদ্য মজুত বেড়েছে দেড় লাখ মেট্রিক টন চলতি বছরই ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে: প্রধানমন্ত্রী শনিবার টানা ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায় ঢাকা-১৭ আসনের ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক অনুদান আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ইউনিট বন্ধ, দেশে বাড়ছে লোডশেডিং আহত সেনা কর্মকর্তাকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের কার্ড ইস্যুর সফটওয়্যার তৈরি করবে নির্বাচন কমিশন ঢাকায় বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে লাগাম টানার আহ্বান ব্রিকসের

সাংবাদিক

ব্রিকস জোটের শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিন গতকাল শনিবার গৃহীত যৌথ ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে লাগাম টানার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে সমর্থন জানিয়ে জোটের দুই সদস্যদেশ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণাপত্রে সই করেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধে দেশ দুটির ভিন্ন অবস্থান থাকলেও যৌথ ঘোষণায় তাদের সমর্থনকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে বৈঠক হয়। চলমান উত্তেজনা শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা। আবুধাবির সরকারি তথ্যমতে, দুই নেতা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু, সংঘাত প্রশমন, স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়ন জোরদারের নানা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সম্মেলনে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’য় নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে সব ধরনের একতরফা সামরিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এতে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে জোর দেওয়া হয়।

সম্মেলনে বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানায় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকস। সদস্য দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একতরফা অর্থনৈতিক বাধা দূর করার দাবি জানিয়েছে তারা।

রয়টার্স ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৯তম শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে জোটের যৌথ ঘোষণাপত্র ‘ব্রিকস নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিকস নেতারা এ ঘোষণা দিলেন। ঘোষণাপত্রে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সব ধরনের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্টসহ ১১ সদস্যের এই জোটের অন্য নেতারা অংশ নিচ্ছেন।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শি জিনপিং 
সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্রিকস জোটের দেশগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ ওই অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ধ্বংস ডেকে এনেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থেরও পরিপন্থি।

শি জিনপিং ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে যে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত বাণিজ্য শুল্কের সমালোচনা করে তিনি সব ধরনের ‘সুরক্ষাবাদ’ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান। তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) কেন্দ্র করে একটি স্থিতিশীল বহুমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থা বজায় রাখার পক্ষে মত দেন।

শি জিনপিং ব্রিকস জোটকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃস্থানীয় এবং উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতার মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই জোটের উচিত উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা। শি ঘোষণা করেন, আগামী বছর চীন ব্রিকসের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেবে এবং ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করবে।

মোদি-শি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়ে দুই নেতা প্রতিশ্রুতি দেন। মোদি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং আগের চুক্তিগুলো মেনে চলা জরুরি। দুই দেশের মতভেদ যেন কখনও বড় বিরোধে রূপ না নেয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংবেদনশীলতা ও স্বার্থ– এই তিন নীতি অনুসরণের ওপর জোর দেন তিনি।

গাজা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান 
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবটি আমলে নিয়ে সব পক্ষকে গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পূর্ণ ও অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে কোনো নীতি বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছে ব্রিকস জোট। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান শুধু শান্তিপূর্ণ উপায়েই অর্জন করা সম্ভব বলে আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি। এটি ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার, যার মধ্যে রয়েছে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিজ ভূমিতে ফিরে আসার অধিকার।’

পরোক্ষ সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের, নিন্দা ইসরায়েলের
ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সমালোচনা করা হয়েছে। এখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেওয়া না হলেও ওয়াশিংটনের একতরফা শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার নীতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে কৌশলী শব্দ ব্যবহার করলেও গাজা ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করেছে ব্রিকস। লেবাননের ভূখণ্ড থেকে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য
ব্রিকসের দুই নতুন সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা চলছে। যুদ্ধের কারণে গত আগস্টে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করে আমিরাত। গত মে মাসেও দুই দেশের মতপার্থক্যের কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা যায়নি। এবার নয়াদিল্লি সম্মেলনে সব পক্ষকে একটি অভিন্ন ঘোষণাপত্রে সম্মত করানোকে ভারতের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইসরায়েল ও ইরানের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার দাবি 
ব্রিকস নেতারা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় জরুরি সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমা বিশ্ব অনুচিত প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। জোটের দেশগুলো নিজস্ব ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা এবং এআই প্রযুক্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলো টেকসই পরিবহন অবকাঠামো তৈরিতে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিমানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন নেতারা।

প্রসঙ্গত, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ০৪:০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫০৩ Time View

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে লাগাম টানার আহ্বান ব্রিকসের

আপডেটের সময় : ০৪:০৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্রিকস জোটের শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিন গতকাল শনিবার গৃহীত যৌথ ঘোষণাপত্রে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে লাগাম টানার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে সমর্থন জানিয়ে জোটের দুই সদস্যদেশ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণাপত্রে সই করেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধে দেশ দুটির ভিন্ন অবস্থান থাকলেও যৌথ ঘোষণায় তাদের সমর্থনকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে বৈঠক হয়। চলমান উত্তেজনা শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা। আবুধাবির সরকারি তথ্যমতে, দুই নেতা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু, সংঘাত প্রশমন, স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়ন জোরদারের নানা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

সম্মেলনে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’য় নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে সব ধরনের একতরফা সামরিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এতে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে জোর দেওয়া হয়।

সম্মেলনে বিশ্ব বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানায় উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকস। সদস্য দেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একতরফা অর্থনৈতিক বাধা দূর করার দাবি জানিয়েছে তারা।

রয়টার্স ও আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৯তম শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে জোটের যৌথ ঘোষণাপত্র ‘ব্রিকস নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিকস নেতারা এ ঘোষণা দিলেন। ঘোষণাপত্রে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সব ধরনের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্টসহ ১১ সদস্যের এই জোটের অন্য নেতারা অংশ নিচ্ছেন।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শি জিনপিং 
সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্রিকস জোটের দেশগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ ওই অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক ধ্বংস ডেকে এনেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাধারণ স্বার্থেরও পরিপন্থি।

শি জিনপিং ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে যে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত বাণিজ্য শুল্কের সমালোচনা করে তিনি সব ধরনের ‘সুরক্ষাবাদ’ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান। তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) কেন্দ্র করে একটি স্থিতিশীল বহুমুখী বাণিজ্য ব্যবস্থা বজায় রাখার পক্ষে মত দেন।

শি জিনপিং ব্রিকস জোটকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃস্থানীয় এবং উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মনির্ভরশীলতার মডেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই জোটের উচিত উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা। শি ঘোষণা করেন, আগামী বছর চীন ব্রিকসের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেবে এবং ১৯তম শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করবে।

মোদি-শি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়ে দুই নেতা প্রতিশ্রুতি দেন। মোদি বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং আগের চুক্তিগুলো মেনে চলা জরুরি। দুই দেশের মতভেদ যেন কখনও বড় বিরোধে রূপ না নেয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংবেদনশীলতা ও স্বার্থ– এই তিন নীতি অনুসরণের ওপর জোর দেন তিনি।

গাজা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান 
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবটি আমলে নিয়ে সব পক্ষকে গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পূর্ণ ও অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে কোনো নীতি বন্ধেরও আহ্বান জানিয়েছে ব্রিকস জোট। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ‘ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান শুধু শান্তিপূর্ণ উপায়েই অর্জন করা সম্ভব বলে আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি। এটি ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার, যার মধ্যে রয়েছে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিজ ভূমিতে ফিরে আসার অধিকার।’

পরোক্ষ সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের, নিন্দা ইসরায়েলের
ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সমালোচনা করা হয়েছে। এখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেওয়া না হলেও ওয়াশিংটনের একতরফা শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার নীতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে কৌশলী শব্দ ব্যবহার করলেও গাজা ও লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করে সমালোচনা করেছে ব্রিকস। লেবাননের ভূখণ্ড থেকে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য
ব্রিকসের দুই নতুন সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা চলছে। যুদ্ধের কারণে গত আগস্টে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করে আমিরাত। গত মে মাসেও দুই দেশের মতপার্থক্যের কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা যায়নি। এবার নয়াদিল্লি সম্মেলনে সব পক্ষকে একটি অভিন্ন ঘোষণাপত্রে সম্মত করানোকে ভারতের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ইসরায়েল ও ইরানের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার দাবি 
ব্রিকস নেতারা বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় জরুরি সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমা বিশ্ব অনুচিত প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। জোটের দেশগুলো নিজস্ব ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা এবং এআই প্রযুক্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলো টেকসই পরিবহন অবকাঠামো তৈরিতে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে বিমানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন নেতারা।

প্রসঙ্গত, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।