ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে গ্রামে শিশুরা থাকে দুধেভাতে

সাংবাদিক

কাকডাকা ভোরে ঘুম ভাঙে গ্রামের। আলো ফোটার আগেই নারী-পুরুষ ছুটে যান গোয়ালঘরে। কেউ গোয়াল পরিষ্কার করেন, কেউ গাভির শরীর ধুয়ে দেন। গোবর সরিয়ে রাখা হয় নির্দিষ্ট স্থানে। গাভিকে দেওয়া হয় ঘাস, খড়, ভুসি, খৈলসহ নানা খাবার। এরপর শুরু হয় দুধ দোহন।

ছোট-বড় অ্যালুমিনিয়াম কলসি কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে দুধ ভরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পুরুষরা। কারও গন্তব্য স্থানীয় বাজার, কারও দুধ যায় ডেইরি প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহকেন্দ্রে। গৃহবধূরা কিছু দুধ গরম করেন চুলায়। এই দুধ পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি জোগায়, বিশেষ করে শিশুরা বেড়ে ওঠে দুধেভাতে।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রাম। এর পাশেই সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জেয়ালা গ্রাম। দুই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন গাভি আছে। দুধ উৎপাদন ও বিক্রির কারণে স্থানীয়ভাবে গ্রাম দুটি পরিচিতি পেয়েছে ‘দুধ গ্রাম’ নামে।

একসময় এ দুটি গ্রামের গাভি পালন মূলত ঘোষ পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুধ বিক্রি করে ভালো আয় হওয়ায় এখন অন্য পরিবারগুলোও এ কাজে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চণ্ডীপুর ও জেয়ালার দুই শতাধিক পরিবার গাভি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। পাশের নলতা, আঠারোই ও আরনগর গ্রামের অনেক পরিবারও একই পথে হাঁটছে।

গাভির দুধেই সংসারের চাকা
চণ্ডীপুর গ্রামের রিপন ঘোষ এক যুগ ধরে বিদেশি জাতের গাভি পালন করছেন। তাঁর খামারে রয়েছে ছয়টি গাভি। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার দুধ পান তিনি। প্রতি লিটার ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করে মাসে আয় করেন প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। গরুর খাবারের খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থে চলে চার সদস্যের সংসার। নিজের পরিবারের জন্যও প্রতিদিনের টাটকা দুধ মিলছে এই খামার থেকেই।
জেয়ালা গ্রামের বিক্রম ঘোষ ও তাঁর বাবার খামারে রয়েছে ৪৫টি বিদেশি জাতের গাভি। প্রতিদিন তাদের খামার থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। একই গ্রামের প্রতিবেশী সুনীল ঘোষের রয়েছে ১০টি গাভি। ৯ বছর ধরে দুধ বিক্রির আয়েই চলছে তাঁর সংসার।

গ্রামবাসীর ভাষ্য, বাড়িতে অল্প জায়গায় গাভি পালন করা যায়। ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। ধান, গম বা পাটের চাষের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে এটি বেশি লাভজনক। কারও বাড়িতে ৫ থেকে ১০টি গাভি থাকলেও বড় খামারিদের কারও কারও ২০ থেকে ৪০টি গাভি রয়েছে।

দুধ বিক্রি করে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে তাদের জীবনযাপনও। অনেকের বাড়ি পাকা হয়েছে। ঘরে এসেছে টেলিভিশন, ফ্রিজ, ফ্যানসহ নানা আসবাব। কেউ কিনেছেন মোটরসাইকেল। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের সন্তানদের পাতে খাঁটি দুধ ঢেলে দিতে পারেন। দুধে ওদের গায়ে বাড়ে বল। পড়াশোনার প্রতিও ওরা মনোযোগী।
জেয়ালার প্রবীর ঘোষ ও সুচিত্রা রানী ঘোষ জানান, আগে অনেক বাড়িতে দেশি জাতের গাভি পালন করা হতো। এখন অধিকাংশ পরিবার উন্নত জাতের গাভি পালন করছে। গাভির আকার ও জাতভেদে প্রতিটি গাভি থেকে দিনে সাত থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়।

দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার দুধ
গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেয়ালা গ্রামের ১৬০টি পরিবারের কাছে রয়েছে প্রায় এক হাজার ৬৮৯টি গাভি। চণ্ডীপুরের ৪০টি পরিবারের কাছে রয়েছে প্রায় ৪১০টি। দুই গ্রামে প্রতিদিন উৎপাদিত হয় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার দুধ।

এই দুধের বড় একটি অংশ যায় খুলনা ও সাতক্ষীরার ডেইরি প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান ও বিভিন্ন পরিবারের কাছে। সকালে ও বিকেলে দিনে দুবার দুধ দোহন করেন খামারিরা। এরপর তা নিয়ে যাওয়া হয় সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এবং ডুমুরিয়ার শাহাপুর, থুকড়া ও দৌলতপুর এলাকার মিল্ক ভিটার সংগ্রহ কেন্দ্রে।

দুই গ্রামের মাঝামাঝি রয়েছে আকিজ ডেইরির দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র। ডুমুরিয়ার আঠারোমাইল বাজারে রয়েছে ব্র্যাক ডেইরির সংগ্রহ কেন্দ্রও।
চণ্ডীপুর গ্রামের পূর্ণিমা ঘোষ ও জেয়ালা গ্রামের চায়না রানী ঘোষ বলেন, তারা ঘরের বউ হয়ে আসার পর থেকেই দেখছেন গ্রামের অনেক পরিবার গাভি পালন করছে। এখানকার মানুষ গাভির প্রতি খুবই যত্নবান। অনেকে মায়ের মতোই দেখেন। এ কারণেই গাভি পালন ও দুধ উৎপাদনে সফল হয়েছেন।

গোবর থেকে জ্বালানি
গাভি পালন শুধু দুধ বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গোবর থেকেও আয় করছেন গ্রামের মানুষ। কেউ তৈরি করছেন ঘুঁটে, কেউ স্থাপন করেছেন বায়োগ্যাসের চুলা।
চণ্ডীপুর গ্রামের দেবী রানী ঘোষ জানান, তারা প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫টি ঘুঁটে তৈরি করেন। প্রতিটি ঘুঁটে বিক্রি হয় তিন থেকে সাড়ে তিন টাকায়। এতে রান্নার জ্বালানি যেমন হয়, তেমনি বাড়তি আয়ও আসে।

বাজার আছে, অনিশ্চয়তাও
এত বিপুল পরিমাণ দুধ উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। খামারিদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় দুধ সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে কখনও কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। আবার ক্রেতা না পেলে দুধ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

খামারি অসিত কুমার ঘোষ ও সদানন্দ ঘোষ বলেন, মিল্ক ভিটা সপ্তাহে এক দিন এবং ব্র্যাক ডেইরি সপ্তাহে দুদিন দুধ কেনা বন্ধ রাখে। ওই সময় দুধ নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে কম দামে মিষ্টির দোকানে দুধ বিক্রি করতে হয়। তাদের আরেকটি অভিযোগ, গাভি কেনা বা খামার সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পাওয়া যায় না।
চণ্ডীপুর দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সুবীর ঘোষ বলেন, সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দুই গ্রামে গাভির সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব। তাঁর অভিযোগ, তারা প্রত্যাশিত সরকারি সহযোগিতা পাচ্ছেন না।

সড়ক না থাকায় ভোগান্তি
দুই গ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভবতোষ ঘোষ ও সুকান্ত ঘোষ জানান, গ্রাম দুটিতে এখনও কোনো পাকা সড়ক নেই। ফলে বড় গাড়ি ঢুকতে পারে না। নছিমন, ভ্যান বা ছোট পিকআপে করে দুধ নিতে হয় গ্রামের বাইরে। একইভাবে গাভির খাবারও আনতে হয় এসব ছোট যানবাহনে। বর্ষাকালে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
গাভি অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিয়েও ভোগান্তির কথা জানান খামারিরা। তাদের ভাষ্য, নিয়মিত প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা বা চিকিৎসকদের দেখা পাওয়া যায় না। তড়কা, বাদলা, খুরা, গলাফোলা, কৃমিসহ বিভিন্ন রোগে গাভি আক্রান্ত হলে তারা সমস্যায় পড়েন।

তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, তাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল আলম বলেন, গাভির সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক টিকা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় খামারিদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। বিনামূল্যে কৃমিনাশকও দেওয়া হয়। এ ছাড়া খামারিদের ফ্লোর ম্যাট, মশারি ও ঘাস কাটার মেশিন দেওয়া হয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতার কারণে সব ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া সম্ভব হয় না। জনবল সংকটও রয়েছে।

সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা
গাভি পালন এখন শুধু কয়েকটি পরিবারের পেশা নয়; দুই গ্রামের শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছে। দুধ বিক্রির পাশাপাশি গোবর থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং স্থানীয় বাজারে দুধের সরবরাহ– সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক বলয়।

খামারিরা বলছেন, দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, নিয়মিত প্রাণিসম্পদ সেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে এই সম্ভাবনা আরও বড় হতে পারে।
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগার লবি বলেন, উন্নত জাতের গাভি পালনের জন্য ওই দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। গ্রামের কাঁচা ও আধাপাকা সড়কগুলো পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে দুধ উৎপাদনের পর তা সহজে বাজারজাত করা যায়।
ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার ব্যস্ত হয়ে উঠবে চণ্ডীপুর ও জেয়ালার গোয়ালঘর। গাভির ডাক, দুধ দোহনের শব্দ আর সাইকেলের ঘণ্টা মিলিয়ে শুরু হবে আরেকটি দিনের কর্মযজ্ঞ। যে গ্রাম একসময় ছিল সাধারণ জনপদ, গাভির দুধকে ঘিরে সেই এখন পরিচিত– ‘দুধ গ্রাম’ নামে।

ট্যাগ :

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ০৪:৩১:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫০৪ Time View

যে গ্রামে শিশুরা থাকে দুধেভাতে

আপডেটের সময় : ০৪:৩১:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাকডাকা ভোরে ঘুম ভাঙে গ্রামের। আলো ফোটার আগেই নারী-পুরুষ ছুটে যান গোয়ালঘরে। কেউ গোয়াল পরিষ্কার করেন, কেউ গাভির শরীর ধুয়ে দেন। গোবর সরিয়ে রাখা হয় নির্দিষ্ট স্থানে। গাভিকে দেওয়া হয় ঘাস, খড়, ভুসি, খৈলসহ নানা খাবার। এরপর শুরু হয় দুধ দোহন।

ছোট-বড় অ্যালুমিনিয়াম কলসি কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে দুধ ভরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পুরুষরা। কারও গন্তব্য স্থানীয় বাজার, কারও দুধ যায় ডেইরি প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহকেন্দ্রে। গৃহবধূরা কিছু দুধ গরম করেন চুলায়। এই দুধ পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি জোগায়, বিশেষ করে শিশুরা বেড়ে ওঠে দুধেভাতে।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রাম। এর পাশেই সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জেয়ালা গ্রাম। দুই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন গাভি আছে। দুধ উৎপাদন ও বিক্রির কারণে স্থানীয়ভাবে গ্রাম দুটি পরিচিতি পেয়েছে ‘দুধ গ্রাম’ নামে।

একসময় এ দুটি গ্রামের গাভি পালন মূলত ঘোষ পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুধ বিক্রি করে ভালো আয় হওয়ায় এখন অন্য পরিবারগুলোও এ কাজে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চণ্ডীপুর ও জেয়ালার দুই শতাধিক পরিবার গাভি পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে। পাশের নলতা, আঠারোই ও আরনগর গ্রামের অনেক পরিবারও একই পথে হাঁটছে।

গাভির দুধেই সংসারের চাকা
চণ্ডীপুর গ্রামের রিপন ঘোষ এক যুগ ধরে বিদেশি জাতের গাভি পালন করছেন। তাঁর খামারে রয়েছে ছয়টি গাভি। প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার দুধ পান তিনি। প্রতি লিটার ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করে মাসে আয় করেন প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। গরুর খাবারের খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থে চলে চার সদস্যের সংসার। নিজের পরিবারের জন্যও প্রতিদিনের টাটকা দুধ মিলছে এই খামার থেকেই।
জেয়ালা গ্রামের বিক্রম ঘোষ ও তাঁর বাবার খামারে রয়েছে ৪৫টি বিদেশি জাতের গাভি। প্রতিদিন তাদের খামার থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। একই গ্রামের প্রতিবেশী সুনীল ঘোষের রয়েছে ১০টি গাভি। ৯ বছর ধরে দুধ বিক্রির আয়েই চলছে তাঁর সংসার।

গ্রামবাসীর ভাষ্য, বাড়িতে অল্প জায়গায় গাভি পালন করা যায়। ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। ধান, গম বা পাটের চাষের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে এটি বেশি লাভজনক। কারও বাড়িতে ৫ থেকে ১০টি গাভি থাকলেও বড় খামারিদের কারও কারও ২০ থেকে ৪০টি গাভি রয়েছে।

দুধ বিক্রি করে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে তাদের জীবনযাপনও। অনেকের বাড়ি পাকা হয়েছে। ঘরে এসেছে টেলিভিশন, ফ্রিজ, ফ্যানসহ নানা আসবাব। কেউ কিনেছেন মোটরসাইকেল। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের সন্তানদের পাতে খাঁটি দুধ ঢেলে দিতে পারেন। দুধে ওদের গায়ে বাড়ে বল। পড়াশোনার প্রতিও ওরা মনোযোগী।
জেয়ালার প্রবীর ঘোষ ও সুচিত্রা রানী ঘোষ জানান, আগে অনেক বাড়িতে দেশি জাতের গাভি পালন করা হতো। এখন অধিকাংশ পরিবার উন্নত জাতের গাভি পালন করছে। গাভির আকার ও জাতভেদে প্রতিটি গাভি থেকে দিনে সাত থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়।

দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার দুধ
গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেয়ালা গ্রামের ১৬০টি পরিবারের কাছে রয়েছে প্রায় এক হাজার ৬৮৯টি গাভি। চণ্ডীপুরের ৪০টি পরিবারের কাছে রয়েছে প্রায় ৪১০টি। দুই গ্রামে প্রতিদিন উৎপাদিত হয় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার দুধ।

এই দুধের বড় একটি অংশ যায় খুলনা ও সাতক্ষীরার ডেইরি প্রতিষ্ঠান, মিষ্টির দোকান ও বিভিন্ন পরিবারের কাছে। সকালে ও বিকেলে দিনে দুবার দুধ দোহন করেন খামারিরা। এরপর তা নিয়ে যাওয়া হয় সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এবং ডুমুরিয়ার শাহাপুর, থুকড়া ও দৌলতপুর এলাকার মিল্ক ভিটার সংগ্রহ কেন্দ্রে।

দুই গ্রামের মাঝামাঝি রয়েছে আকিজ ডেইরির দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র। ডুমুরিয়ার আঠারোমাইল বাজারে রয়েছে ব্র্যাক ডেইরির সংগ্রহ কেন্দ্রও।
চণ্ডীপুর গ্রামের পূর্ণিমা ঘোষ ও জেয়ালা গ্রামের চায়না রানী ঘোষ বলেন, তারা ঘরের বউ হয়ে আসার পর থেকেই দেখছেন গ্রামের অনেক পরিবার গাভি পালন করছে। এখানকার মানুষ গাভির প্রতি খুবই যত্নবান। অনেকে মায়ের মতোই দেখেন। এ কারণেই গাভি পালন ও দুধ উৎপাদনে সফল হয়েছেন।

গোবর থেকে জ্বালানি
গাভি পালন শুধু দুধ বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গোবর থেকেও আয় করছেন গ্রামের মানুষ। কেউ তৈরি করছেন ঘুঁটে, কেউ স্থাপন করেছেন বায়োগ্যাসের চুলা।
চণ্ডীপুর গ্রামের দেবী রানী ঘোষ জানান, তারা প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫টি ঘুঁটে তৈরি করেন। প্রতিটি ঘুঁটে বিক্রি হয় তিন থেকে সাড়ে তিন টাকায়। এতে রান্নার জ্বালানি যেমন হয়, তেমনি বাড়তি আয়ও আসে।

বাজার আছে, অনিশ্চয়তাও
এত বিপুল পরিমাণ দুধ উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। খামারিদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় দুধ সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে কখনও কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। আবার ক্রেতা না পেলে দুধ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

খামারি অসিত কুমার ঘোষ ও সদানন্দ ঘোষ বলেন, মিল্ক ভিটা সপ্তাহে এক দিন এবং ব্র্যাক ডেইরি সপ্তাহে দুদিন দুধ কেনা বন্ধ রাখে। ওই সময় দুধ নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে কম দামে মিষ্টির দোকানে দুধ বিক্রি করতে হয়। তাদের আরেকটি অভিযোগ, গাভি কেনা বা খামার সম্প্রসারণের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পাওয়া যায় না।
চণ্ডীপুর দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সুবীর ঘোষ বলেন, সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দুই গ্রামে গাভির সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব। তাঁর অভিযোগ, তারা প্রত্যাশিত সরকারি সহযোগিতা পাচ্ছেন না।

সড়ক না থাকায় ভোগান্তি
দুই গ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভবতোষ ঘোষ ও সুকান্ত ঘোষ জানান, গ্রাম দুটিতে এখনও কোনো পাকা সড়ক নেই। ফলে বড় গাড়ি ঢুকতে পারে না। নছিমন, ভ্যান বা ছোট পিকআপে করে দুধ নিতে হয় গ্রামের বাইরে। একইভাবে গাভির খাবারও আনতে হয় এসব ছোট যানবাহনে। বর্ষাকালে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
গাভি অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিয়েও ভোগান্তির কথা জানান খামারিরা। তাদের ভাষ্য, নিয়মিত প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা বা চিকিৎসকদের দেখা পাওয়া যায় না। তড়কা, বাদলা, খুরা, গলাফোলা, কৃমিসহ বিভিন্ন রোগে গাভি আক্রান্ত হলে তারা সমস্যায় পড়েন।

তবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, তাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল আলম বলেন, গাভির সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক টিকা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় খামারিদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। বিনামূল্যে কৃমিনাশকও দেওয়া হয়। এ ছাড়া খামারিদের ফ্লোর ম্যাট, মশারি ও ঘাস কাটার মেশিন দেওয়া হয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতার কারণে সব ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া সম্ভব হয় না। জনবল সংকটও রয়েছে।

সম্ভাবনার নতুন ঠিকানা
গাভি পালন এখন শুধু কয়েকটি পরিবারের পেশা নয়; দুই গ্রামের শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছে। দুধ বিক্রির পাশাপাশি গোবর থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং স্থানীয় বাজারে দুধের সরবরাহ– সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক বলয়।

খামারিরা বলছেন, দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, নিয়মিত প্রাণিসম্পদ সেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে এই সম্ভাবনা আরও বড় হতে পারে।
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগার লবি বলেন, উন্নত জাতের গাভি পালনের জন্য ওই দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। গ্রামের কাঁচা ও আধাপাকা সড়কগুলো পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে দুধ উৎপাদনের পর তা সহজে বাজারজাত করা যায়।
ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার ব্যস্ত হয়ে উঠবে চণ্ডীপুর ও জেয়ালার গোয়ালঘর। গাভির ডাক, দুধ দোহনের শব্দ আর সাইকেলের ঘণ্টা মিলিয়ে শুরু হবে আরেকটি দিনের কর্মযজ্ঞ। যে গ্রাম একসময় ছিল সাধারণ জনপদ, গাভির দুধকে ঘিরে সেই এখন পরিচিত– ‘দুধ গ্রাম’ নামে।