ঢাকা , শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুলশান–বনানী পূজামণ্ডপের এবারের থিম ‘জলজ’

সাংবাদিক

শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হচ্ছে আগামীকাল শুক্রবার। মহাষষ্ঠীতে ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটছে বাঙালির শারদোৎসবের। জীবন, সৃষ্টি ও প্রকৃতির সঙ্গে জলের নিবিড় সম্পর্ককে উপজীব্য করে রাজধানীর গুলশান–বনানী পূজামণ্ডপে এবার দুর্গাপূজার থিম হলো- ‘জলজ: জীবন-সৃষ্টি, পরম শক্তির মহাজাগতিক বন্দনা’।

জলজ জীববৈচিত্র্য, বাংলার নদীনির্ভর জীবনধারা এবং জল সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, কুটিরশিল্প, আলোকনকশা ও পরিবেশবান্ধব উপকরণের সমন্বয় করা হয়েছে। বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কে আয়োজিত এ শারদোৎসব সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকছে।

বৃহস্পতিবার গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অনন্ত মহাবিশ্বের শতকোটি গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে পৃথিবীই একমাত্র প্রাণোচ্ছল নীলাভ নীড়, আর এই প্রাণের অস্তিত্বের প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো জল। আধুনিক বিজ্ঞান যেমন পৃথিবীতে জীবনের সূচনাকে জলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনি হাজার হাজার বছর আগে বৈদিক ঋষিরাও জলকেই সৃষ্টির আদি তত্ত্ব হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বাবস্থার বর্ণনায় বলা হয়েছে – সৃষ্টির আদিতে সর্বত্র ছিল অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক অসীম জলরাশি। সনাতন ভাবনায় পঞ্চমহাভূতের মধ্যে ‘অপ’ বা জলই সেই মূল উপাদান, যা বাকি সব উপাদানের মাঝে প্রাণসঞ্চার করে। নদী, বৃষ্টি, পুকুর, বিল ও সমুদ্রের সঙ্গে গড়ে ওঠা আমাদের রূপসী বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির গভীরে জলের এই অস্তিত্বকেই এবার দুর্গাপূজার ভাবনায় ধারণ করে গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন বেছে নিয়েছে অনন্য এক থিম – ‘জলজ’ (জল থেকে যার জন্ম)।

গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন জানায়, সনাতন ধর্মে জল কেবল একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়; জল স্বয়ং পবিত্রতা, পরমেশ্বর ও পরম সংস্কারের স্তম্ভ। মাতৃগর্ভের তরল থেকে শুরু করে গঙ্গাতীরে জীবনের শেষ অঞ্জলি – মানুষের সমগ্র জীবনচক্র জলের প্রবাহেই বাঁধা। জলই মাঙ্গলিক সূচনা, ঘটস্থাপন, তর্পণ, হোম কিংবা আত্মশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী মা কেবল শক্তিরূপা নন, তিনি জীবের জীবনধারণের মূল আকুতি:‘তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা!’ জলের বুক চিরে যেমন পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি জীবচেতনার তৃষ্ণা থেকেই প্রকাশিত হন মহাশক্তি মা দুর্গা।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, মণ্ডপসজ্জায় বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢেউয়ের আদলে তৈরি বহুস্তরীয় কাঠামো, জলপ্রপাতের দৃশ্য, প্রতিফলন পুকুর এবং আলোকসজ্জার সমন্বয়ে তৈরি করা হবে একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ। প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের ভেতর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের চলাচলের পথ এমনভাবে সাজানো হবে, যাতে প্রকৃতির গতিশীলতা থেকে প্রশান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি নান্দনিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

আয়োজকরা জানান, ‘জলজ’ কেবল ধর্মীয় অনুভূতির মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি তার আবেদনকে প্রসারিত করেছে বৈশ্বিক ও পরিবেশগত সামাজিক দায়বদ্ধতায়। আজ জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও জলদূষণের কারণে পৃথিবীর জলচক্র মারাত্মক সংকটে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এই সংকট অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই জলকে সম্মান করা ও রক্ষা করা মানেই জীবন, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। ‘জলজ’ মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার, প্রকৃতিকে ভালোবাসার এবং জীবমণ্ডলকে রক্ষা করার এক সানন্দ আহ্বান।

পূজামণ্ডপের পরিকল্পনা, নকশা ও তত্ত্বাবধান করছেন স্থপতি অমিতি কুন্ডু এবং শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ১১:১৫:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
৫০৫ Time View

গুলশান–বনানী পূজামণ্ডপের এবারের থিম ‘জলজ’

আপডেটের সময় : ১১:১৫:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হচ্ছে আগামীকাল শুক্রবার। মহাষষ্ঠীতে ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটছে বাঙালির শারদোৎসবের। জীবন, সৃষ্টি ও প্রকৃতির সঙ্গে জলের নিবিড় সম্পর্ককে উপজীব্য করে রাজধানীর গুলশান–বনানী পূজামণ্ডপে এবার দুর্গাপূজার থিম হলো- ‘জলজ: জীবন-সৃষ্টি, পরম শক্তির মহাজাগতিক বন্দনা’।

জলজ জীববৈচিত্র্য, বাংলার নদীনির্ভর জীবনধারা এবং জল সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, কুটিরশিল্প, আলোকনকশা ও পরিবেশবান্ধব উপকরণের সমন্বয় করা হয়েছে। বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কে আয়োজিত এ শারদোৎসব সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকছে।

বৃহস্পতিবার গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অনন্ত মহাবিশ্বের শতকোটি গ্রহ-নক্ষত্রের মাঝে পৃথিবীই একমাত্র প্রাণোচ্ছল নীলাভ নীড়, আর এই প্রাণের অস্তিত্বের প্রথম ও প্রধান পূর্বশর্ত হলো জল। আধুনিক বিজ্ঞান যেমন পৃথিবীতে জীবনের সূচনাকে জলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনি হাজার হাজার বছর আগে বৈদিক ঋষিরাও জলকেই সৃষ্টির আদি তত্ত্ব হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির পূর্বাবস্থার বর্ণনায় বলা হয়েছে – সৃষ্টির আদিতে সর্বত্র ছিল অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক অসীম জলরাশি। সনাতন ভাবনায় পঞ্চমহাভূতের মধ্যে ‘অপ’ বা জলই সেই মূল উপাদান, যা বাকি সব উপাদানের মাঝে প্রাণসঞ্চার করে। নদী, বৃষ্টি, পুকুর, বিল ও সমুদ্রের সঙ্গে গড়ে ওঠা আমাদের রূপসী বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির গভীরে জলের এই অস্তিত্বকেই এবার দুর্গাপূজার ভাবনায় ধারণ করে গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন বেছে নিয়েছে অনন্য এক থিম – ‘জলজ’ (জল থেকে যার জন্ম)।

গুলশান–বনানী সর্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন জানায়, সনাতন ধর্মে জল কেবল একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়; জল স্বয়ং পবিত্রতা, পরমেশ্বর ও পরম সংস্কারের স্তম্ভ। মাতৃগর্ভের তরল থেকে শুরু করে গঙ্গাতীরে জীবনের শেষ অঞ্জলি – মানুষের সমগ্র জীবনচক্র জলের প্রবাহেই বাঁধা। জলই মাঙ্গলিক সূচনা, ঘটস্থাপন, তর্পণ, হোম কিংবা আত্মশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী মা কেবল শক্তিরূপা নন, তিনি জীবের জীবনধারণের মূল আকুতি:‘তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা!’ জলের বুক চিরে যেমন পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি জীবচেতনার তৃষ্ণা থেকেই প্রকাশিত হন মহাশক্তি মা দুর্গা।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, মণ্ডপসজ্জায় বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢেউয়ের আদলে তৈরি বহুস্তরীয় কাঠামো, জলপ্রপাতের দৃশ্য, প্রতিফলন পুকুর এবং আলোকসজ্জার সমন্বয়ে তৈরি করা হবে একটি স্বতন্ত্র পরিবেশ। প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের ভেতর পর্যন্ত দর্শনার্থীদের চলাচলের পথ এমনভাবে সাজানো হবে, যাতে প্রকৃতির গতিশীলতা থেকে প্রশান্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি নান্দনিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

আয়োজকরা জানান, ‘জলজ’ কেবল ধর্মীয় অনুভূতির মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি তার আবেদনকে প্রসারিত করেছে বৈশ্বিক ও পরিবেশগত সামাজিক দায়বদ্ধতায়। আজ জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও জলদূষণের কারণে পৃথিবীর জলচক্র মারাত্মক সংকটে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এই সংকট অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই জলকে সম্মান করা ও রক্ষা করা মানেই জীবন, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। ‘জলজ’ মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার, প্রকৃতিকে ভালোবাসার এবং জীবমণ্ডলকে রক্ষা করার এক সানন্দ আহ্বান।

পূজামণ্ডপের পরিকল্পনা, নকশা ও তত্ত্বাবধান করছেন স্থপতি অমিতি কুন্ডু এবং শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহা।