২৬ বছর আত্মগোপনে, শেষ বয়সে যে কারণে আদালতে আত্মসমর্পণ নুর মুহাম্মদের
বয়স ১০৪ বছর। শরীর ভেঙে পড়েছে, স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাও করতে পারেন না। নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসা লাগে। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে নুর মুহাম্মদের চাওয়া ছিল খুব সন্তানদের কাছে ফিরে তাদের সঙ্গে বাকি দিনগুলো কাটানো। সেই আশাতেই ২৬ বছর আত্মগোপনে থাকার পর আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন তিনি।
পরিবারের আশা ছিল, বয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় জামিন পাবেন। তাহলে জীবনের শেষ কটা দিন সন্তানদের সঙ্গে কাটাতে পারবেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি। ২৬ বছর আগের ডাকাতি ও জোড়া খুনের মামলায় আত্মসমর্পণের পর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক ফারজানা ইয়াসমিনের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন নুর মুহাম্মদ। আপিলের শর্তে জামিনের আবেদন করেছিলেন তিনি। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
নুর মুহাম্মদ কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বেরুয়াইল ইউনিয়নের বেরুয়াইল গ্রামের বাসিন্দা।
নুর মুহাম্মদের আইনজীবী ফয়সাল আহমেদ বলেন, তার মক্কেলের বয়স ১০৪ বছর। তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না এবং বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধ প্রয়োজন। বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় মানবিক কারণে তাকে জামিন দেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী মিজানুর রহমান জানান, অসুস্থতার কারণে নিজ খরচে পরিবহনের মাধ্যমে কারাগারে যাওয়ার আবেদনও করেছিলেন নুর মুহাম্মদ। আদালত সেই আবেদনও নামঞ্জুর করেন।
নুর মুহাম্মদের ছেলে আবদুল করিম বলেন, বাবা একসময় কিশোরগঞ্জ শহরের বড়বাজার এলাকায় কাপড়ের ব্যবসা করতেন। পরে সন্তানদের নিয়ে নরসিংদীতে চলে যান। সেখানে ছেলেদের সঙ্গে জুট মিলে কাজ করতেন। কিন্তু মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর স্বাভাবিক জীবন আর ফিরে পাননি।
তিনি বলেন, মামলায় সাজা হওয়ার বিষয়টি প্রথমদিকে বাবা জানতেন না। পরে জানতে পেরে ভয় পেয়ে আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘদিন পরিবারের কাছ থেকেও দূরে থাকতে হয়েছে তাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আত্মগোপনের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না, নিয়মিত ওষুধ লাগে। যে বাসায় এতদিন লুকিয়ে ছিলেন, সম্প্রতি সেখানেও থাকা তার জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। তখনই পরিবারের সবাই মিলে তাকে আদালতে আত্মসমর্পণ করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
করিম বলেন, বাবা আর কয়দিন বাঁচবে। আমাদের সঙ্গে থাকলেও ভয় ছিল, কেউ ষড়যন্ত্র করে তাকে ধরিয়ে দিতে পারে। এ জন্য তিনি আমাদের সঙ্গেও থাকতেন না। এখন আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। জামিন পেলে জীবনের বাকি সময়টা আমাদের সঙ্গে কাটাবেন—এটাই চেয়েছিলাম।’
করিমের দাবি, তার বাবা ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। পারিবারিক বিরোধের জেরে ষড়যন্ত্র করে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছিল। তার এক ফুফাতো বোনকে বাজিতপুরের পিরিজপুর এলাকার এক ব্যক্তি জোর করে বিয়ে করেছিলেন। পরে নুর মুহাম্মদ তাকে সেখান থেকে এনে অন্যত্র বিয়ে দেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ওই ব্যক্তি পরে বড়বাজারের ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে নুর মুহাম্মদের নাম জড়িয়ে দেন। তার বাবাকে কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। পরে স্বীকার করলে কিছু হবে না—এমন আশ্বাসে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
নুর মুহাম্মদের ছোট ভাই জাল মাহমুদও (৮৮) ভাইকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আমার ভাই নির্দোষ। ষড়যন্ত্র করে তাকে ওই মামলায় জড়ানো হয়েছে। এখন তার বয়স ১০৪ বছর। শেষ বয়সে অন্তত সন্তানদের কাছে থাকার সুযোগ দেওয়া হোক।
জাল মাহমুদ জানান, ৭০-৮০ বছর আগে তার ভাই নুর মোহাম্মদ তাদের বাড়ি ছাড়েন। এরপর তিনি শহরের কানিকাটা রেললাইনের পাশে শশুরবাড়ি এলাকায় জায়গা কিনে বসবাস শুরু করেন। তার ভাইয়ের সাত ছেলে ও তিন মেয়ে সন্তান রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা চাঁন মিয়া ও আক্কাস মিয়াও নুর মুহাম্মদকে ভালো মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরিবারের দাবি, ডাকাতির সময় নুর মুহাম্মদ নরসিংদীতে ছিলেন। তবে মামলার নথিতে নুর মুহাম্মদের বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা এবং তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির তথ্য রয়েছে।
যে মামলায় ২৬ বছর পর কারাগারে মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে কিশোরগঞ্জের বড়বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মো. ফেরদৌসের দোকানে ডাকাতি হয়। এ সময় মোশাররফ হোসেন ও আবদুল কবির নিহত হন। ডাকাতেরা দোকানের সিন্দুক থেকে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ১১০ ভরি স্বর্ণ লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ফেরদৌস কিশোরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০০২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।
২০০৩ সালের ১৬ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল নুর মোহাম্মদসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বিচার চলাকালে হারিছ মিয়া নামে এক আসামি মারা যান। পরে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে ২০০৭ সালের ১৯ আগস্ট উচ্চ আদালত আলমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অন্য আসামিদের সাজা কমিয়ে দেন। ওই রায়ে নুর মুহাম্মদের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, রায় ঘোষণার সময় নুর মুহাম্মদ পলাতক ছিলেন। এর আগে জামিন নিয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন।


























২৬ বছর আত্মগোপনে, শেষ বয়সে যে কারণে আদালতে আত্মসমর্পণ নুর মুহাম্মদের