পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে শিহাব শহিদুলের ‘নগরঘড়ি ও সুবোধ’
অমর একুশে বইমেলা শেষ হলেও আলোচনায় রয়েছে নতুন লেখকদের বই। সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে শিহাব শহিদুলের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নগরঘড়ি ও সুবোধ’, যা প্রকাশ করেছে জয়তী প্রকাশনী। সমকালীন নগরজীবনের নানা দিক উঠে আসায় বইটি ইতোমধ্যে পাঠকমহলে আগ্রহ তৈরি করেছে।
শিহাব শহিদুল পেশাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক। অর্থনীতি ও প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা তার পর্যবেক্ষণশক্তি এই গল্পগ্রন্থে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কর্মজীবনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা তাকে দিয়েছে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যা শহরজীবনের সূক্ষ্ম বাস্তবতাকে ধরতে সহায়তা করেছে।
‘নগরঘড়ি ও সুবোধ’ মূলত শহুরে জীবনের বহুমাত্রিক গল্প নিয়ে রচিত। বারোটি গল্পের এই সংকলনে উঠে এসেছে মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, প্রতারণা এবং সময়ের নির্মম বাস্তবতা। প্রতিটি গল্পে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজকে দেখার চেষ্টা করেছেন লেখক। গল্পগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে সেই মানুষ, যে ব্যস্ত শহরের ভিড়েও একাকীত্বে বসবাস করে।
প্রচলিত গল্পধারার বাইরে গিয়ে লেখক শহরকে কেবল ভৌত অবকাঠামো হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের আকাঙ্ক্ষা, ভাঙন ও অনিশ্চয়তার এক জটিল রূপ হিসেবে তুলে ধরেছেন। বইয়ের শিরোনামও প্রতীকী ‘নগরঘড়ি’ যেন সময়ের নিরন্তর প্রবাহ, আর ‘সুবোধ’ সেই সময়ের ভেতর নিজেকে খুঁজে ফেরা মানুষের প্রতিরূপ।
গল্পগুলোর অন্যতম শক্তি নগরবাস্তবতার প্রতি লেখকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। আধুনিক শহরের কঠোরতার মাঝেও মানুষ কীভাবে স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে থাকে, আবার সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বেদনা সবই উঠে এসেছে তার লেখায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, শহরের গল্প বলতে গিয়ে লেখক মফস্বলের মানুষকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। গ্রাম বা ছোট শহর থেকে বড় শহরে আসা মানুষের স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব বারবার ফিরে এসেছে গল্পে। এই সংঘাতই বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজীব্য হয়ে উঠেছে। অপ্রয়োজনীয় অলঙ্কার এড়িয়ে সাবলীল বর্ণনায় লেখক পাঠককে গল্পের ভেতরে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে পাঠক অনেক সময় নিজের জীবনকেও গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন।
একই সঙ্গে গল্পগুলোর ভেতরে সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে। সমাজের অসাম্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রাম এসব বিষয় সরাসরি বক্তব্যের পরিবর্তে চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। এতে গল্পগুলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিস্তৃত হয়েছে।
বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাহিত্যিক ও বিশিষ্টজনরাও এর প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, শিহাব শহিদুলের লেখায় যে মানবিকতা ও সংবেদনশীলতা রয়েছে, তা পাঠকের সঙ্গে সহজেই সংযোগ তৈরি করবে। প্রথম বই হিসেবেই ‘নগরঘড়ি ও সুবোধ’ সম্ভাবনার একটি শক্ত ইঙ্গিত বহন করছে।
বাংলা গল্পসাহিত্যে নগরজীবন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় শিহাব শহিদুলের এই বইটি নতুন সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে ‘নগরঘড়ি ও সুবোধ’ কেবল একটি গল্পগ্রন্থ নয়; এটি শহর, সময় এবং মানুষের সম্পর্কের এক সাহিত্যিক প্রতিফলন।























