২৫০ কনটেইনারের হদিস নিয়ে বিভ্রান্তি, কী বলছে বন্দর-কাস্টমস?
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। প্রতিবছর প্রায় ৩৪ থেকে ৩৫ লাখ কনটেইনার এই বন্দর দিয়ে হ্যান্ডলিং হয়। কঠোর নিরাপত্তা, ডিজিটাল নজরদারি এবং একাধিক সংস্থার তদারকির মধ্যে পরিচালিত এই বন্দরে “২৫০টি পণ্যবোঝাই কনটেইনারের হদিস নেই” এমন অভিযোগ সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি বা সন্দেহজনক ঘোষণার কারণে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক করে রাখা ২৫০টি কনটেইনারের অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তারা একাধিকবার বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। বন্দরের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কনটেইনারও নিখোঁজ হয়নি। আলোচিত কনটেইনারগুলোর মধ্যে ৮৮টি কাস্টমসের আউটপাসের মাধ্যমে নিয়ম অনুযায়ী ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে, ৭০টি বিভিন্ন অফডকে পাঠানো হয়েছে এবং ১৩১টি এখনো বন্দরের ইয়ার্ডে রয়েছে। পাশাপাশি কাস্টমসের পাঠানো তালিকায় কিছু বিএল নম্বরেও ভুল রয়েছে বলে বন্দর দাবি করেছে।
বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কনটেইনার বন্দরে প্রবেশ থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত একাধিক স্তরের নিরাপত্তা, সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল রেকর্ড এবং কাস্টমস, বন্দর, শিপিং এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে শত শত কনটেইনার কোনো রেকর্ড ছাড়াই হারিয়ে যাওয়ার দাবি অত্যন্ত গুরুতর এবং সেটি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের সমুদ্রবন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ কারণে বন্দরসংশ্লিষ্ট একটি মহলের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক লাইফলাইন পরিচালনায় স্থানীয় সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো ধারণা জনমনে তৈরি হলে বিদেশি অপারেটরদের সম্পৃক্ততার পক্ষে পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের আশঙ্কার পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
ব্যবসায়ীদের মতে, বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি দীর্ঘায়িত হলে শুধু বন্দর নয়, দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও ভুল বার্তা যেতে পারে। তাই কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের উচিত যৌথভাবে তথ্য যাচাই করে দ্রুত প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোথাও অনিয়ম থেকে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। আর যদি এটি তথ্যগত অসামঞ্জস্য বা প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি হয়ে থাকে, তাহলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি আস্থা অটুট রাখা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক সত্য উদঘাটন করা। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম, দক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।




















