কিশোর বয়সে ত্বকের যত্নে ৫ সহজ নিয়ম
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নিখুঁত ত্বক’ বা ‘গ্লাস স্কিন’-এর নানা রকম রুটিন এখন কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও জনপ্রিয়। ইনফ্লুয়েন্সারদের ‘গেট রেডি উইথ মি’ (জিআরডব্লিউএম) ভিডিও দেখে অনেকেই ত্বকের যত্নে একের পর এক পণ্য ব্যবহার শুরু করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর বয়সে ত্বকের যত্নের জন্য জটিল ও বহু ধাপের রুটিনের প্রয়োজন নেই। বরং সহজ কিছু অভ্যাসই এ বয়সের ত্বকের জন্য যথেষ্ট।
‘গ্লাস স্কিন’ নিয়ে ভুল ধারণা
কনসালট্যান্ট ডার্মাটোলজিস্ট ডা. জোনাথন কেন্টলি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রভাব হলো অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করা। অতিরিক্ত ফিল্টার করা ছবিগুলো দেখে শিশু-কিশোরদের মনে ‘গ্লাস স্কিন’ অর্জন করা সম্ভব বলে ধারণা তৈরি হচ্ছে। বাস্তবে ত্বকের লোমকূপ দৃশ্যমান হওয়া, ব্ল্যাকহেডস, দাগ-ছোপ, পিগমেন্টেশন, লালচে ভাব ও ক্ষতচিহ্ন থাকা স্বাভাবিক। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ৮০ শতাংশের বেশি বয়ঃসন্ধিকালে ব্রণের সমস্যায় ভোগে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়নাব লাফতাহ বলেন, বয়ঃসন্ধিকালে ত্বকের অনেক সমস্যার সঙ্গে টেস্টোস্টেরন হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। এই হরমোন ত্বকে তেলের নিঃসরণ বাড়াতে পারে। এর পাশাপাশি লোমকূপ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও প্রদাহের কারণে ব্ল্যাকহেডস, হোয়াইটহেডস এবং প্রদাহযুক্ত ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
তিন পণ্যেই ত্বকের যত্ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর-কিশোরীদের ত্বকের যত্নের রুটিন সহজ রাখা উচিত। একটি মৃদু ক্লিনজার, সুগন্ধি-মুক্ত ময়েশ্চারাইজার এবং এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি মাত্রার ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন—এই তিনটি পণ্যই প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট।অনেক বেশি পণ্য ব্যবহার করলেই যে ত্বক ভালো থাকবে, এমন নয়। ঘন ঘন এক্সফোলিয়েশন বা কড়া অ্যাসিডযুক্ত পণ্য কম বয়সী ত্বকে জ্বালাপোড়া ও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। এ বয়সে ত্বকের সুরক্ষাস্তর বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ এখনো বিকশিত হচ্ছে। ফলে ভুলভাবে অতিরিক্ত পণ্য ব্যবহারে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।
অ্যাসিড ও রেটিনয়েডে সতর্কতা
ডা. কেন্টলি জানান, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ‘পেরিওরাল ডার্মাটাইটিস’ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। মুখের চারপাশে প্রদাহজনিত এই সমস্যা ত্বকের সুরক্ষাস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এক্সফোলিয়েটিং হাইড্রক্সি অ্যাসিড ও রেটিনয়েডের মতো উপাদান অতিরিক্ত ব্যবহারে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। ডা. লাফতাহ বলেন, কিশোর-কিশোরীরা এখন বড়দের মতো সিরাম, টোনার, মাস্ক ও বিভিন্ন সক্রিয় উপাদানসমৃদ্ধ পণ্য ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। এসব উপাদান ত্বকের সুরক্ষাস্তর দুর্বল করে আরও নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বকের ক্ষেত্রে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড উপকারী হতে পারে। এটি লোমকূপের গভীরে থাকা সিবাম ও মৃত কোষ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। তবে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যবহার করলে ত্বক শুষ্ক ও জ্বালাপোড়া-প্রবণ হয়ে যেতে পারে।
ঘুম ও খাবারেও নজর
ত্বকের যত্নে শুধু প্রসাধনী পণ্যের ওপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ডা. লাফতাহ বলেন, ঘুমের অভাবে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এই স্ট্রেস হরমোন ব্রণ বা ফুসকুড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত। ডা. কেন্টলি জানান, বিভিন্ন গবেষণায় অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার, যেমন সাদা চাল ও পাস্তা, চিনিযুক্ত খাবার এবং প্রোটিন শেকে থাকা ‘হোয়ি প্রোটিন’-এর সঙ্গে ব্রণ বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে প্রত্যেকের ত্বক আলাদা হওয়ায় একই খাবারের প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক নাও হতে পারে।
ব্রণ খুঁটবেন না
ব্রণ বা ফুসকুড়ি খুঁটে বা চেপে ফাটানো উচিত নয়। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং প্রদাহ আরও তীব্র হতে পারে। চাপ দেওয়ার ফলে ব্রণের ভেতরের উপাদান ত্বকের আরও গভীরে চলে গিয়ে দাগ বা ত্বকের রঙের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। ডা. লাফতাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ‘পিম্পল হাইড্রোকলয়েড স্টার প্যাচ’ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এসব প্যাচ ব্রণের তরল শুষে নেওয়ার পাশাপাশি একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, ফলে ব্রণ খোঁচানো বা স্পর্শ করার প্রবণতাও কমে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
দীর্ঘস্থায়ী, যন্ত্রণাদায়ক সিস্টিক ব্রণ বা ব্রণের কারণে দাগ পড়তে শুরু করলে জিপি (সাধারণ চিকিৎসক) অথবা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রেসক্রিপশনভিত্তিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। গুরুতর ত্বকের সমস্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. কেন্টলি।
ছেলেদের ত্বকে যা হয়
কিশোর বয়সে ছেলেদের ত্বকের অনেক সমস্যার সঙ্গেও অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। মেয়েদের শরীরেও এই হরমোন থাকে, তবে ছেলেদের শরীরে এর মাত্রা বেশি। ফলে ছেলেদের ত্বক তুলনামূলক বেশি তৈলাক্ত হতে পারে এবং ব্রণ বা দাগের প্রবণতাও বেশি দেখা দিতে পারে। এ বয়সেই ছেলেরা মুখের লোম ও শেভ করার সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করে। সঠিকভাবে শেভ না করলে লোমকূপের গোড়ায় প্রদাহ বা ‘ফলিকুলাইটিস’ হতে পারে, যা অনেকটা ব্রণের মতো দেখায়। এতে ত্বকের সুরক্ষাস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তীব্র প্রদাহও হতে পারে।
নিরাপদে শেভ করার নিয়ম
ত্বকের ক্ষতি কমাতে গোসলের পর শেভ করা ভালো। এতে ত্বক গরম ও আর্দ্র থাকে এবং শেভের জন্য প্রস্তুত হয়। শেভ করার আগে লোমগুলো সোজা করতে শেভিং ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে। শেভ করার সময় শেভিং ফোম বা শাওয়ার জেলের মতো পিচ্ছিলকারক উপাদান ব্যবহার করা উচিত। সবসময় লোম যেদিকে গজায় বা যে দিকে থাকে, সেই দিকেই শেভ করার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. কেন্টলি।
কিশোর বয়সে ত্বকের যত্নে তাই জটিল রুটিনের চেয়ে নিয়মিত ও সহজ যত্নই গুরুত্বপূর্ণ। ত্বকের ধরন বুঝে প্রয়োজনীয় পণ্য ব্যবহার, পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবারের অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে ত্বক সুস্থ রাখার সহজ উপায়।




























সাইফউদ্দিনের জায়গায় আলিস আল ইসলাম!