ঢাকা , রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ দিচ্ছে সরকার

সাংবাদিক

দেশের শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সামঞ্জস্য নিশ্চিতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ‘গোল্ডেন জিপিএ-৫’ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনাসহ শিক্ষা খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ করা হয়েছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, দেশের শিক্ষা খাতের সার্বিক সংস্কার ও উন্নয়নে বেশ কিছু ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে, যা বিগত সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪২.৭ শতাংশ বেশি।

এক নজরে মূল সিদ্ধান্তসমূহ:
  • এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ প্রদান।
  • ইএফটি (EFT) ও iBas++ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রেরণ।
  • গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বছরভিত্তিক মূল্যায়ন প্রবর্তন।
  • মালয়েশিয়ার শিক্ষা মডেলের আদলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা রূপায়ণ।

এর আগে খুলনার একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের জন্য প্রযুক্তিবান্ধব উদ্যাগের কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর মিডিয়া সেল থেকে নিশ্চিত করা হয় যে, এ বছর গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের বিনামূল্যে ল্যাপটপ দেওয়া হবে।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া দ্রুত মেটানোর এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া জানান, শুধু পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার প্রকৃত মাপকাঠি হতে পারে না। শুধুমাত্র বছরভিত্তিক নয়, বরং প্রতি ৩ বা ৬ মাস অন্তর শিখনফল মূল্যায়নের পদ্ধতি চালু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সরকার বা ব্যক্তি পরিবর্তনের সাথে যাতে বার বারবার শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত না হয়, সেজন্য মালয়েশিয়ার মডেলের আদলে স্থায়ী কাঠামো গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া জোর দিয়ে বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রবর্তন জরুরি।

শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটি ৭ দফা সুপারিশ পেশ করেছে: শিক্ষার মান পরিমাপে বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক সূচক ও মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়তে কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে স্কুল-কলেজ পরিদর্শন। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবোর্ডের প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধে আলাদা তালিকা তৈরি। বাজেটের সাপেক্ষে অন্যান্য বকেয়া ভাতা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা পরিচালনা করা। শিক্ষকদের নিয়মিত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো।

দেশের শিক্ষাবিদরা সরকারের এ উদ্যোগ এবং সংসদীয় কমিটির সুপারিশকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, কৃত্রিম পাসের হারের বদলে শিখনফল ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম চালু হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক ও স্থায়ী রূপান্তর ঘটবে।

ট্যাগ :

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ১১:০৪:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
৫১১ Time View

৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ দিচ্ছে সরকার

আপডেটের সময় : ১১:০৪:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

দেশের শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সামঞ্জস্য নিশ্চিতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ‘গোল্ডেন জিপিএ-৫’ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ, শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনাসহ শিক্ষা খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ করা হয়েছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, দেশের শিক্ষা খাতের সার্বিক সংস্কার ও উন্নয়নে বেশ কিছু ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে, যা বিগত সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪২.৭ শতাংশ বেশি।

এক নজরে মূল সিদ্ধান্তসমূহ:
  • এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ প্রদান।
  • ইএফটি (EFT) ও iBas++ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রেরণ।
  • গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বছরভিত্তিক মূল্যায়ন প্রবর্তন।
  • মালয়েশিয়ার শিক্ষা মডেলের আদলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা রূপায়ণ।

এর আগে খুলনার একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের জন্য প্রযুক্তিবান্ধব উদ্যাগের কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর মিডিয়া সেল থেকে নিশ্চিত করা হয় যে, এ বছর গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের বিনামূল্যে ল্যাপটপ দেওয়া হবে।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া দ্রুত মেটানোর এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া জানান, শুধু পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার প্রকৃত মাপকাঠি হতে পারে না। শুধুমাত্র বছরভিত্তিক নয়, বরং প্রতি ৩ বা ৬ মাস অন্তর শিখনফল মূল্যায়নের পদ্ধতি চালু করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সরকার বা ব্যক্তি পরিবর্তনের সাথে যাতে বার বারবার শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত না হয়, সেজন্য মালয়েশিয়ার মডেলের আদলে স্থায়ী কাঠামো গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া জোর দিয়ে বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রবর্তন জরুরি।

শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় কমিটি ৭ দফা সুপারিশ পেশ করেছে: শিক্ষার মান পরিমাপে বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক সূচক ও মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়তে কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে স্কুল-কলেজ পরিদর্শন। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবোর্ডের প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া পাওনা দ্রুত পরিশোধে আলাদা তালিকা তৈরি। বাজেটের সাপেক্ষে অন্যান্য বকেয়া ভাতা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা পরিচালনা করা। শিক্ষকদের নিয়মিত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো।

দেশের শিক্ষাবিদরা সরকারের এ উদ্যোগ এবং সংসদীয় কমিটির সুপারিশকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, কৃত্রিম পাসের হারের বদলে শিখনফল ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রম চালু হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক ও স্থায়ী রূপান্তর ঘটবে।