ঢাকা , মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লুটপাট-সহিংসতা : প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ‘স্থানীয় কারফিউ’ জারি

সাংবাদিক

বিক্ষোভ, সহিংসতা, লুটপাট এবং দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি প্রতিরোধ করতে রাজধানী প্যারিস, গুরুত্বপূর্ণ শহর লিল, নিসসহ বিভিন্ন শহরে স্থানীয় বা লোকালাইজড কারফিউ জারি করেছে ফ্রান্সের সরকার। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের সংঘাতপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর থাকবে এই কারফিউ।

গতকাল সোমবার প্যারিসের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়েন লেকোর্নু এক আদেশে এই কারফিউ জারি করেছেন। তবে জরুরি অবস্থা এখনও ঘোষণা করেননি তিনি।

কারফিউ জারি করার পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে লেকোর্নু বলেন, “সরকার দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে অবিচল। আমরা এখনও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছি না; কারণ আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতিতে আংশিক ও স্থানীয় পর্যায়ে কারফিউ জারি করাই বেশি যৌক্তিক।”

প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, সরকারের কারফিউ আদেশের আওতায় রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ‘প্লাস দে লা রিপাবলিক’ ও ‘লে হাল’ এলাকায় রাত ১১টা থেকে কারফিউ জারি করা হয়েছে। উভয় বিধিনিষেধই মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

“এসব পদক্ষেপ কঠোরভাবে কার্যকর করতে উক্ত এলাকাগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে”, সোমবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে প্যারিস পুলিশ।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু’র দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় মেয়রদের সম্মতিক্রমে লিল, দুয়ে, ওয়াটিনি ও দেনেইন শহরে মঙ্গল ও বুধ— এ দু’দিনের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ আরোপ করা হয়েছে।

নিস শহরের মেয়র এরিক সিওত্তি অনলাইনে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন যে, তিনি নিস শহরের কেন্দ্রস্থলে রাতের বেলা অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলের ওপর কারফিউ জারির আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।

মার্সেই শহরে সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এদিকে, ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আগামী ৫ নভেম্বর নতুন করে ধর্মঘট ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে।

ফ্রান্সে লুটপাট-সহিংসতা, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির  অবনতির এই চিত্র দেখা গেছে গত শনি ও রোববার। তার আগে দেশের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল।

পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় মাস আগে ঘটা এসব ঘটনা ফ্রান্সকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং দেশটির দুর্বল অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা থেকে সৃষ্ট চাপকে সামনে নিয়ে এসেছে।

Caption

 

কট্টর বামপন্থিদের দোষারোপ করলেন লেকর্নু

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ অস্থিরতার জন্য ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থি দলগুলোকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু। সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “আসলে একটি উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা—সহজ কথায় বলতে গেলে—প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়।”

উগ্র-বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ তাকে এর সপক্ষে প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় লেকর্নুকে লক্ষ্য করে তিনি লিখেছেন, “যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তার স্বপক্ষে প্রমাণ দিতে হবে তাকে। অন্যথায় তার উচিত ক্ষমা চাওয়া, চুপ থাকা এবং অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢালা বন্ধ করা।”

ফ্রান্সের খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফেডারেশন অফ ট্রেড অ্যান্ড রিটেইল জানিয়েছে, শনি ও রোববার রাজধানী প্যারিসসহ দেশজুড়ে প্রায় ৩,০০০ দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, “লুটপাটের শিকার প্রতিটি দোকানের পেছনে রয়েছেন ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও তাদের পরিবার—যাদের বছরের পর বছর ধরে করা কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।”

তারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও কর ছাড়ের দাবি জানিয়েছে ফেডারেশন অফ ট্রেড অ্যান্ড রিটেইল।

লেকর্নু জানিয়েছেন, সরকার মঙ্গলবার থেকে কর্মীদের সাময়িক কর্মবিরতি বা ‘ফার্লো’ সংক্রান্ত সহায়তা ব্যবস্থা চালু করবে।

মার্সেইতে দুটি পোশাক দোকানের ব্যবস্থাপক জেরার্ড নুচি—যার দোকানের সম্মুখভাগ কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে—জানান, লুটপাটকারীদের থামানোর মতো পর্যাপ্ত পুলিশ সেখানে ছিল না।

নুচি বলেন, “তারা সবকিছু তছনছ করেছে, ভাঙচুর চালিয়েছে এবং আমাদের অপমান করেছে। মনে হচ্ছিল যেন সত্যিকারের এক টর্নেডো বয়ে গেছে।”

জুনিয়র ডিজিটাল মন্ত্রী অ্যান লে হেনানফ ‘এক্স’-এ লিখেছেন, সরকার এমন সব প্ল্যাটফর্মকে নির্দেশ দিয়েছে যারা লুট করা পণ্য বিক্রি করছে; তাদের অবিলম্বে সেই বিজ্ঞাপনগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে এবং বিক্রেতাদের বিচারের আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার এক বিক্ষোভকারী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এবং প্রায় ১,০০০ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

সূত্র : রয়টার্স

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ১০:৩৯:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
৫০২ Time View

লুটপাট-সহিংসতা : প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ‘স্থানীয় কারফিউ’ জারি

আপডেটের সময় : ১০:৩৯:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বিক্ষোভ, সহিংসতা, লুটপাট এবং দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি প্রতিরোধ করতে রাজধানী প্যারিস, গুরুত্বপূর্ণ শহর লিল, নিসসহ বিভিন্ন শহরে স্থানীয় বা লোকালাইজড কারফিউ জারি করেছে ফ্রান্সের সরকার। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের সংঘাতপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর থাকবে এই কারফিউ।

গতকাল সোমবার প্যারিসের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়েন লেকোর্নু এক আদেশে এই কারফিউ জারি করেছেন। তবে জরুরি অবস্থা এখনও ঘোষণা করেননি তিনি।

কারফিউ জারি করার পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে লেকোর্নু বলেন, “সরকার দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে অবিচল। আমরা এখনও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করছি না; কারণ আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতিতে আংশিক ও স্থানীয় পর্যায়ে কারফিউ জারি করাই বেশি যৌক্তিক।”

প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, সরকারের কারফিউ আদেশের আওতায় রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ‘প্লাস দে লা রিপাবলিক’ ও ‘লে হাল’ এলাকায় রাত ১১টা থেকে কারফিউ জারি করা হয়েছে। উভয় বিধিনিষেধই মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

“এসব পদক্ষেপ কঠোরভাবে কার্যকর করতে উক্ত এলাকাগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে”, সোমবার সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে প্যারিস পুলিশ।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু’র দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় মেয়রদের সম্মতিক্রমে লিল, দুয়ে, ওয়াটিনি ও দেনেইন শহরে মঙ্গল ও বুধ— এ দু’দিনের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ আরোপ করা হয়েছে।

নিস শহরের মেয়র এরিক সিওত্তি অনলাইনে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন যে, তিনি নিস শহরের কেন্দ্রস্থলে রাতের বেলা অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলের ওপর কারফিউ জারির আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।

মার্সেই শহরে সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এদিকে, ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আগামী ৫ নভেম্বর নতুন করে ধর্মঘট ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে।

ফ্রান্সে লুটপাট-সহিংসতা, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির  অবনতির এই চিত্র দেখা গেছে গত শনি ও রোববার। তার আগে দেশের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছিল।

পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় মাস আগে ঘটা এসব ঘটনা ফ্রান্সকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং দেশটির দুর্বল অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা থেকে সৃষ্ট চাপকে সামনে নিয়ে এসেছে।

Caption

 

কট্টর বামপন্থিদের দোষারোপ করলেন লেকর্নু

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম ভয়াবহ অস্থিরতার জন্য ফ্রান্সের কট্টর বামপন্থি দলগুলোকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু। সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “আসলে একটি উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা—সহজ কথায় বলতে গেলে—প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশে গভীর অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়।”

উগ্র-বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ তাকে এর সপক্ষে প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় লেকর্নুকে লক্ষ্য করে তিনি লিখেছেন, “যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তার স্বপক্ষে প্রমাণ দিতে হবে তাকে। অন্যথায় তার উচিত ক্ষমা চাওয়া, চুপ থাকা এবং অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢালা বন্ধ করা।”

ফ্রান্সের খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফেডারেশন অফ ট্রেড অ্যান্ড রিটেইল জানিয়েছে, শনি ও রোববার রাজধানী প্যারিসসহ দেশজুড়ে প্রায় ৩,০০০ দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, “লুটপাটের শিকার প্রতিটি দোকানের পেছনে রয়েছেন ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও তাদের পরিবার—যাদের বছরের পর বছর ধরে করা কঠোর পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।”

তারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও কর ছাড়ের দাবি জানিয়েছে ফেডারেশন অফ ট্রেড অ্যান্ড রিটেইল।

লেকর্নু জানিয়েছেন, সরকার মঙ্গলবার থেকে কর্মীদের সাময়িক কর্মবিরতি বা ‘ফার্লো’ সংক্রান্ত সহায়তা ব্যবস্থা চালু করবে।

মার্সেইতে দুটি পোশাক দোকানের ব্যবস্থাপক জেরার্ড নুচি—যার দোকানের সম্মুখভাগ কাঠের তক্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে—জানান, লুটপাটকারীদের থামানোর মতো পর্যাপ্ত পুলিশ সেখানে ছিল না।

নুচি বলেন, “তারা সবকিছু তছনছ করেছে, ভাঙচুর চালিয়েছে এবং আমাদের অপমান করেছে। মনে হচ্ছিল যেন সত্যিকারের এক টর্নেডো বয়ে গেছে।”

জুনিয়র ডিজিটাল মন্ত্রী অ্যান লে হেনানফ ‘এক্স’-এ লিখেছেন, সরকার এমন সব প্ল্যাটফর্মকে নির্দেশ দিয়েছে যারা লুট করা পণ্য বিক্রি করছে; তাদের অবিলম্বে সেই বিজ্ঞাপনগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে এবং বিক্রেতাদের বিচারের আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার এক বিক্ষোভকারী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এবং প্রায় ১,০০০ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।

সূত্র : রয়টার্স