অপরাধের দায়, আধিপত্য ও তৃণমূলের অসন্তোষ: কবিরহাটে নির্বাচনী সমীকরণে বিএনপিকে ঘিরে তীব্র জনরোষ
মোহাম্মদ শহিদ, নোয়াখালী প্রতিনিধি:- নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে গভীর অনিশ্চয়তার হাওয়া। দীর্ঘ দিন ধরে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের শান্তিতে যে ব্যাঘাত ঘটেছে, তার পেছনে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তির নাম বারবার উঠে আসছে।
বিশেষ করে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার এবং নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে যাদের নাম অভিযুক্ত, তাদের বড় একটি অংশই কৌশলগতভাবে বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের পদ-পদবি বা ছত্রছায়াকে ব্যবহার করছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। অপরাধীদের এমন প্রকাশ্যে বিচরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে দলীয় বা প্রশাসনিক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন কবিরহাট উপজেলায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। ফলে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বিএনপির ভোটব্যাংকে। যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে মাদক চক্র ও সন্ত্রাসী গ্যাং-এর আস্ফালন কবিরহাট উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে মাদকের বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশকে রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে ব্যবহার করার অজুহাতে কিছু বিতর্কিত নেতা তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
এতে করে স্থানীয় পর্যায়ে একধরনের ‘কিশোর গ্যাং’ ও সন্ত্রাসী গ্রুপের জন্ম হয়েছে, যারা ইভটিজিং, তুচ্ছ ঘটনায় মারামারি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে লিপ্ত। মাদক ও সন্ত্রাসী চক্রের সাথে জড়িত এমন ব্যক্তিদের নির্বাচনে প্রার্থী করার বা সহায়তা দেওয়ার গুঞ্জন সাধারণ পরিবারগুলোকে গভীর চিন্তায় ফেলেছে। অপরাধের দায় ও প্রশাসনিক শালীনতার সংকট কবিরহাটের ভূঁইয়ারহাট, চাপরাশিরহাট ও ধানশালিকের মতো ব্যস্ত ব্যবসায়িক অঞ্চলগুলোতে ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট অসন্তোষের চিত্র দেখা যায়। জমি সংক্রান্ত সংঘাত নিষ্পত্তির নামে অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনৈতিক হস্তক্ষেপের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠছে কিছু স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের মতে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থা ও নিরাপত্তার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
অপরাধীদের বিষয়ে দলের নিরবতা ও প্রশ্রয় তৃণমূলের ত্যাগী ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝেও চরম হতাশা দেখা গেছে। তাদের অভিযোগ, হামলা-মামলায় যারা রাজপথে ছিল, তাদের অবমূল্যায়ন করে নানা অপরাধে যুক্ত কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। দলের হাইকমান্ড থেকে অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তার কথা বলা হলেও বাস্তবে কবিরহাটে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক শাস্তি বা প্রতিরোধ দৃশ্যমান নয়। ফলে সুশীল সমাজ ও প্রবীণ ভোটাররা দলটির রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তৃণমূলের অসন্তোষ ও স্বতন্ত্রের সম্ভাবনা স্থানীয় নির্বাচন মূলত প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, গ্রহণযোগ্যতা ও এলাকার উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে। দলের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বা কোন্দলে যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়লে বড় একটি অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামতে পারেন। এতে করে মূল ভোটের বিভাজন ঘটবে, যা বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ হতে পারে।
বিকল্পের সন্ধানে ভোটাররা যেখানে বিএনপি একচ্ছত্র জনসমর্থনের প্রত্যাশা করছিল, সেখানে সাধারণ ভোটাররা এখন বিকল্প প্রার্থীর কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। ভোটাররা এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চান, যিনি দলীয় পরিচয়ের চেয়ে স্থানীয় উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশি আন্তরিক হবেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় স্পষ্ট যে, কবিরহাটে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে বিএনপিকে দ্রুত তাদের অভ্যন্তরীণ সংকট দূর করে জনবান্ধব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে হবে।
কবিরহাটের একাধিক সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিক জানান, “আমরা এমন কোনো জনপ্রতিনিধি চাই না, যার পেছনের লোকজন চাঁদাবাজি সন্ত্রাসী কার্যক্রম বা মাদকের সাথে জড়িত। যিনি নির্বাচিত হয়ে অপরাধীদের রক্ষা করবেন, তাকে ভোট দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।” কবিরহাট উপজেলায় বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের যে সমর্থন ছিল, তা এখন চরম পরীক্ষার মুখে। চাঁদাবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে দল যদি এখনই বিতর্কিত ব্যক্তিদের ঝেড়ে ফেলে পরিচ্ছন্ন, সৎ ও জনপ্রিয় প্রার্থীদের সামনে না আনে—তবে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, যা ব্যালটের ফলাফলেই স্পষ্ট প্রতিফলিত হতে পারে।



























আপিল বিভাগে বাগবিতণ্ডা : এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতি