ওজন বাড়ছে, তবু শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি কেন
শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি মানেই একজন মানুষ রোগা বা কম ওজনের—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং একজন ব্যক্তি অতিরিক্ত ওজনের বা স্থূল হওয়ার পরও প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রোটিন গ্রহণ করতে পারেন। কারণ শরীরের ওজন নির্ধারণ করে মূলত মোট ক্যালোরি গ্রহণ ও ব্যয়ের ভারসাম্য, আর প্রোটিন শরীরের জন্য আলাদা একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। তাই বেশি ক্যালোরি খাওয়া মানেই শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন পৌঁছাচ্ছে—এমন নয়।
বিশেষ করে ভাত, রুটি, মিষ্টি, ভাজাপোড়া ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি থাকলে খাবারের পরিমাণ ও ক্যালোরি দুটিই বেশি হতে পারে, কিন্তু প্রোটিনের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকতে পারে। ফলে ওজন বাড়লেও পেশি, শক্তি ও সামগ্রিক পুষ্টির দিক থেকে শরীর প্রয়োজনীয় উপাদান থেকে বঞ্চিত থাকে।
বেশি ক্যালোরি, কম প্রোটিন
শরীরের ওজন বাড়ার সঙ্গে খাবারে প্রোটিনের পরিমাণের সরাসরি সম্পর্ক নেই। প্রক্রিয়াজাত শস্য, চিনি, ভাজাপোড়া ও অন্যান্য উচ্চ-ক্যালোরির খাবার বেশি খেলে শরীরে ক্যালোরির পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু এসব খাবারে প্রয়োজনীয় প্রোটিন নাও থাকতে পারে। ফলে একজন ব্যক্তি দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার খেলেও তাঁর প্রোটিনের চাহিদা পূরণ নাও হতে পারে। অর্থাৎ, খাবারের পরিমাণ বেশি হলেই শরীর প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি পাচ্ছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
শুধু ওজন দিয়ে পুষ্টির হিসাব নয়
ভাত, রুটি ও অন্যান্য শস্যভিত্তিক খাবার অনেকের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার প্রধান অংশ। এসব খাবার খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এতে প্রোটিনের পরিমাণ অনেক সময় তুলনামূলকভাবে কম থাকে। অন্যদিকে ডাল, দই, পনির, ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, সয়া, শিম, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ প্রোটিনের ভালো উৎস। তাই একজন ব্যক্তি দিনে তিনবেলা পেট ভরে খাওয়ার পাশাপাশি স্ন্যাকস খেলেও প্রয়োজনের তুলনায় কম প্রোটিন গ্রহণ করতে পারেন।
পেশির জন্য প্রোটিন জরুরি
শরীরের পেশি ধরে রাখা, টিস্যু বা কলা মেরামত, এনজাইম ও হরমোন তৈরি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। এসব কাজের জন্য শরীরের নিয়মিত অ্যামিনো অ্যাসিডের জোগান প্রয়োজন। পেশি সবসময় ভাঙা ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকে। পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণের পাশাপাশি শারীরিক কার্যকলাপ এই প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
বয়স বাড়লে ঝুঁকি বাড়ে
বয়স বাড়ার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই পেশির ভর ও শক্তি কমতে থাকে। এর সঙ্গে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা অপর্যাপ্ত পুষ্টি যুক্ত হলে পেশি কমার এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হতে পারে। ফলে অতিরিক্ত ওজনের কোনো বয়স্ক ব্যক্তির শরীরে একই সঙ্গে চর্বির পরিমাণ বেশি এবং পেশির ভর কম থাকতে পারে। ওজন মাপার যন্ত্রে ওজন স্থিতিশীল বা বাড়তে দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে পেশির শক্তি কমে যেতে পারে। পেশির শক্তি কমে গেলে হাঁটাচলা, শরীরের ভারসাম্য রক্ষা ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। অসুস্থতা, আঘাত বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ওজন কমানোর সময়ও প্রোটিন দরকার
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সাধারণত ক্যালোরি কমানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ক্যালোরি কোথা থেকে আসছে এবং খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে ক্যালোরি অনেক কমিয়ে দিলে চর্বির পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনীয় পেশিও কমে যেতে পারে। তাই ওজন কমানোর সময় শুধু ওজনের সংখ্যা কমানো নয়, পেশি ও শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
প্রোটিন শুধু জিমে যাওয়াদের জন্য নয়
প্রোটিনের প্রয়োজন শুধু শরীরচর্চা বা খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নয়। জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই শরীরের জন্য প্রোটিন প্রয়োজন। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির জন্য, প্রাপ্তবয়স্কদের টিস্যু রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য এবং বয়স্কদের পেশি ও শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বয়স, শরীরের গঠন, শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও জীবনের বিশেষ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ব্যক্তিভেদে প্রোটিনের চাহিদা ভিন্ন হতে পারে।
খাবারেই মিলতে পারে প্রোটিন
প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করতে সবসময় সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না। ডিম, দুধ ও অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, মুরগির মাংস ও লাল মাংস থেকে উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়া যায়। উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের মধ্যে ডাল, ছোলা, শিম, সয়া, বাদাম ও বিভিন্ন বীজও প্রোটিনের ভালো উৎস। ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী এসব খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
প্রতিটি বেলায় প্রোটিন রাখুন
শুধু দুপুর বা রাতের খাবারে বেশি প্রোটিন রাখার বদলে দিনের বিভিন্ন বেলায় প্রোটিনের উৎস রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। অনেকের সকালের নাশতায় কার্বোহাইড্রেট-জাতীয় খাবার বেশি থাকে। ফলে দিনের অধিকাংশ প্রোটিন দুপুর ও রাতের খাবার থেকেই আসে। নাশতায় ডিম বা টক দই এবং দুপুর বা রাতের খাবারে ডাল, পনির, সয়া, শিম বা অন্য কোনো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। কোন খাবার কতটা খাওয়া উচিত, তা ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে।
অতিরিক্ত ওজন মানেই শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি আছে—এমন নয়। আবার স্বাভাবিক ওজনও পর্যাপ্ত পুষ্টির নিশ্চয়তা দেয় না। শরীরের পুষ্টিগত অবস্থা বুঝতে ওজনের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, পেশির শক্তি, শারীরিক কার্যকলাপ, শরীরের গঠন, বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শরীর প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি পাচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
সূত্র:- এনডিটিভি



























মিমি চক্রবর্তীর বিয়ে নিয়ে জোর গুঞ্জন, পাত্র কে?