ঢাকা , বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অতি গরম চা-কফিতে বাড়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি

সাংবাদিক

সকালের এক কাপ গরম চা কিংবা ধোঁয়া ওঠা কফি—দিন শুরুর সঙ্গে অনেকেরই জড়িয়ে আছে এই অভ্যাস। কেউ আবার কাপ হাতে নিয়েই চুমুক দেন, পানীয়টি একটু ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষাও করেন না। কিন্তু খুব গরম অবস্থায় নিয়মিত চা-কফি পান করার এই অভ্যাসই ডেকে আনতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকি। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম পানীয় নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কতটা গরম পানীয় ঝুঁকিপূর্ণ

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ক্যান্সার’-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয়কে ‘খুব গরম’ হিসেবে ধরা হয়েছে। ৯ লাখ ৭৭ হাজার ২৮২ জন মধ্যবয়সী নারী ও পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, দিনে ছয়বার বা তার বেশি গরম পানীয় পান করার অভ্যাসের সঙ্গেও এই ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।

খাদ্যনালীর ক্ষতি হয় যেভাবে

অত্যন্ত গরম তরল পাকস্থলীতে যাওয়ার সময় খাদ্যনালীর ভেতরের কোষের আস্তরণে ক্ষতি করতে পারে। নিয়মিত এ ধরনের তাপের সংস্পর্শে আসা কোষের ক্ষতি ও প্রদাহের সঙ্গে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। চা বা কফিতে দুধ মেশালে পানীয় কিছুটা ঠান্ডা হয়। তবে দুধ-চা বা দুধ-কফিও অতিরিক্ত গরম অবস্থায় থাকলে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন

কেটলিতে পানি পুরোপুরি ফুটে যাওয়ার পর তৈরি করা চায়ের তাপমাত্রা প্রায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। কাপে ঢালার পরও এর তাপমাত্রা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকতে পারে। তাই পান করার আগে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে পানীয়কে আরামদায়ক তাপমাত্রায় নামিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে বলছে, পানীয় ঠান্ডা হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কত মিনিট অপেক্ষা করতে হবে, তা বলা কঠিন। তবে সংস্থাটির পরামর্শ হলো, খুব গরম অবস্থায় পানীয় না খেয়ে আরামদায়ক তাপমাত্রায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

গবেষকের বক্তব্য

প্রধান গবেষক ড. কেরেন পাপিয়ের জানান, দক্ষিণ আমেরিকায় ‘মাটে’ নামের অত্যন্ত গরম ভেষজ পানীয় পানকারীদের মধ্যেও গরম পানীয় ও খাদ্যনালীর ক্যান্সারের মধ্যে একই ধরনের সম্পর্ক আগে দেখা গেছে। তবে পানীয়ের ঠিক কোন তাপমাত্রা থেকে ঝুঁকি বাড়তে শুরু করে, তা নির্দিষ্ট করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। অন্য একটি গবেষণায় ১১৮ জন তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন তাপমাত্রার ব্ল্যাক কফি পান করানো হয়। এতে দেখা যায়, তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী কফিকে অতিরিক্ত গরম মনে করেন।

কফির আদর্শ তাপমাত্রা

এমটিপ্যাক কফির তথ্য অনুযায়ী, বাইরে নিয়ে গিয়ে পান করার জন্য গরম কফির আদর্শ তাপমাত্রা ৪৯ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। তবে কেউ যদি কফি দীর্ঘ সময় গরম রাখতে চান বা ‘অতিরিক্ত গরম’ কফি চান, সেক্ষেত্রে ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায়ও কফি পরিবেশন করা হয়।

সামগ্রিক ঝুঁকি কতটা

গবেষকদের মতে, খুব গরম পানীয় পান করা বন্ধ করলে প্রতি ১০টি খাদ্যনালীর ক্যান্সারের মধ্যে একটি বা দুটি প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। তবে স্কোয়ামাস সেল ইসোফেজিয়াল ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে বিরল। যুক্তরাজ্যে একজন মানুষের জীবদ্দশায় এ ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১ শতাংশ। তাই অত্যন্ত গরম পানীয় পান করলে ঝুঁকি বাড়লেও ব্যক্তিগতভাবে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ খাদ্যনালীর ক্যান্সারের আরও বড় ঝুঁকির কারণ। ক্যান্সার রিসার্চ ইউকের ফিওনা ওসগুন বলেন, এই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো ধূমপান না করা এবং অ্যালকোহল গ্রহণ কমিয়ে আনা।

যে লক্ষণগুলো খেয়াল করবেন

খাদ্যনালীর ক্যান্সারের লক্ষণের মধ্যে বুক জ্বালাপোড়া, বদহজম, গলা বা বুকে ব্যথা এবং অকারণে ওজন কমে যাওয়া রয়েছে। এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চা-কফির কাপ ছেড়ে দেওয়ার কথা নয়—শুধু অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করার অভ্যাসটি বদলানোই গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের অপেক্ষা হয়তো খুব ছোট একটি পরিবর্তন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য সেটিই হতে পারে সচেতনতার সহজ একটি পদক্ষেপ।

ট্যাগ :

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ০৪:১৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫০২ Time View

অতি গরম চা-কফিতে বাড়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি

আপডেটের সময় : ০৪:১৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সকালের এক কাপ গরম চা কিংবা ধোঁয়া ওঠা কফি—দিন শুরুর সঙ্গে অনেকেরই জড়িয়ে আছে এই অভ্যাস। কেউ আবার কাপ হাতে নিয়েই চুমুক দেন, পানীয়টি একটু ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষাও করেন না। কিন্তু খুব গরম অবস্থায় নিয়মিত চা-কফি পান করার এই অভ্যাসই ডেকে আনতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকি। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম পানীয় নিয়মিত পান করলে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কতটা গরম পানীয় ঝুঁকিপূর্ণ

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটি ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ক্যান্সার’-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার পানীয়কে ‘খুব গরম’ হিসেবে ধরা হয়েছে। ৯ লাখ ৭৭ হাজার ২৮২ জন মধ্যবয়সী নারী ও পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, দিনে ছয়বার বা তার বেশি গরম পানীয় পান করার অভ্যাসের সঙ্গেও এই ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।

খাদ্যনালীর ক্ষতি হয় যেভাবে

অত্যন্ত গরম তরল পাকস্থলীতে যাওয়ার সময় খাদ্যনালীর ভেতরের কোষের আস্তরণে ক্ষতি করতে পারে। নিয়মিত এ ধরনের তাপের সংস্পর্শে আসা কোষের ক্ষতি ও প্রদাহের সঙ্গে খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। চা বা কফিতে দুধ মেশালে পানীয় কিছুটা ঠান্ডা হয়। তবে দুধ-চা বা দুধ-কফিও অতিরিক্ত গরম অবস্থায় থাকলে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন

কেটলিতে পানি পুরোপুরি ফুটে যাওয়ার পর তৈরি করা চায়ের তাপমাত্রা প্রায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। কাপে ঢালার পরও এর তাপমাত্রা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকতে পারে। তাই পান করার আগে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে পানীয়কে আরামদায়ক তাপমাত্রায় নামিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে বলছে, পানীয় ঠান্ডা হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কত মিনিট অপেক্ষা করতে হবে, তা বলা কঠিন। তবে সংস্থাটির পরামর্শ হলো, খুব গরম অবস্থায় পানীয় না খেয়ে আরামদায়ক তাপমাত্রায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

গবেষকের বক্তব্য

প্রধান গবেষক ড. কেরেন পাপিয়ের জানান, দক্ষিণ আমেরিকায় ‘মাটে’ নামের অত্যন্ত গরম ভেষজ পানীয় পানকারীদের মধ্যেও গরম পানীয় ও খাদ্যনালীর ক্যান্সারের মধ্যে একই ধরনের সম্পর্ক আগে দেখা গেছে। তবে পানীয়ের ঠিক কোন তাপমাত্রা থেকে ঝুঁকি বাড়তে শুরু করে, তা নির্দিষ্ট করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। অন্য একটি গবেষণায় ১১৮ জন তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন তাপমাত্রার ব্ল্যাক কফি পান করানো হয়। এতে দেখা যায়, তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী কফিকে অতিরিক্ত গরম মনে করেন।

কফির আদর্শ তাপমাত্রা

এমটিপ্যাক কফির তথ্য অনুযায়ী, বাইরে নিয়ে গিয়ে পান করার জন্য গরম কফির আদর্শ তাপমাত্রা ৪৯ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। তবে কেউ যদি কফি দীর্ঘ সময় গরম রাখতে চান বা ‘অতিরিক্ত গরম’ কফি চান, সেক্ষেত্রে ৮২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায়ও কফি পরিবেশন করা হয়।

সামগ্রিক ঝুঁকি কতটা

গবেষকদের মতে, খুব গরম পানীয় পান করা বন্ধ করলে প্রতি ১০টি খাদ্যনালীর ক্যান্সারের মধ্যে একটি বা দুটি প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। তবে স্কোয়ামাস সেল ইসোফেজিয়াল ক্যান্সার তুলনামূলকভাবে বিরল। যুক্তরাজ্যে একজন মানুষের জীবদ্দশায় এ ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১ শতাংশ। তাই অত্যন্ত গরম পানীয় পান করলে ঝুঁকি বাড়লেও ব্যক্তিগতভাবে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ খাদ্যনালীর ক্যান্সারের আরও বড় ঝুঁকির কারণ। ক্যান্সার রিসার্চ ইউকের ফিওনা ওসগুন বলেন, এই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো ধূমপান না করা এবং অ্যালকোহল গ্রহণ কমিয়ে আনা।

যে লক্ষণগুলো খেয়াল করবেন

খাদ্যনালীর ক্যান্সারের লক্ষণের মধ্যে বুক জ্বালাপোড়া, বদহজম, গলা বা বুকে ব্যথা এবং অকারণে ওজন কমে যাওয়া রয়েছে। এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চা-কফির কাপ ছেড়ে দেওয়ার কথা নয়—শুধু অতিরিক্ত গরম অবস্থায় পান করার অভ্যাসটি বদলানোই গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের অপেক্ষা হয়তো খুব ছোট একটি পরিবর্তন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য সেটিই হতে পারে সচেতনতার সহজ একটি পদক্ষেপ।