বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষায় করনীয় – আবদুস সাত্তার দুলাল
বাংলাদেশ একসময় পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ারকণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয়মহান মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধে বহু সেনাসদস্যও বিভিন্ন পেশার মানুষ আহত ও নিহত হন, অনেকে হারানতাঁদের সহায়-সম্বল। অসংখ্য মা-বোন নির্যাতনের শিকারহন। অনেক নববিবাহিত যুবক বাসর ঘরে না গিয়ে দেশেরস্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে অংশ নেন; তাঁদের অনেকেই আর ফিরেআসেননি।
অবশেষে ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই ভূখণ্ডস্বাধীনতা লাভ করে। পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামেএকটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ অর্জন করে, যাআন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। ভৌগোলিকঅবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণরাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
দেশের সীমানা একটি ভৌত ও রাজনৈতিক সীমারেখা, যারমাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক এলাকা নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের মোট সীমান্ত দৈর্ঘ্য প্রায় ৫,১৩৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটার, মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার এবং জলসীমা প্রায় ৭১১ কিলোমিটার, যার একটি অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত।
স্বাধীনতার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল—মানবাধিকারপ্রতিষ্ঠিত হবে, দারিদ্র্য কমবে, বৈষম্য দূর হবে এবং সকলনাগরিকের সমমর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। আমরাআশা করেছিলাম বাংলাদেশ একটি উন্নত, স্থিতিশীল ও নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থানবিরোধহীন ও টেকসই থাকবে। বাস্তবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাঅপরিসীম, এবং এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের জন্য দেশেরমানুষের মধ্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাও রয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা ও লক্ষ্যঅর্জনের দৃঢ় অঙ্গীকার বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন তার একটিউল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশেষ করে দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় স্বার্থে সবসময় গুরুত্বপূর্ণভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবেদায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনেক সময় এই সম্ভাবনাগুলোযথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেওপ্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি দেখা যায়। ফলেঅনেক সম্ভাবনাময় নাগরিক দেশের উন্নয়নে প্রত্যাশিতঅবদান রাখতে পারছেন না। একই সঙ্গে অনেক তরুণ-তরুণীতাদের মেধা কাজে লাগানোর সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়েপড়ছে এবং অনেকে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে।
অন্যদিকে, দুর্নীতিমুক্ত, সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল পেশাজীবীরসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণনাগরিকরা নানামুখী জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবেঅনেকেই নিজেদের আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তুলতেপারছেন না এবং ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এরঅধিকাংশ নাগরিক কূলকিনারা না পেয়ে লাভের আশায়দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা বহন করছেন। কেউ কেউ জীবিকারতাগিদে অনৈতিক ও অসম্মানজনক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েপড়ছেন, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার জন্যই উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে অবস্থিত হলেওসীমান্ত ব্যবস্থাপনার কিছু দুর্বলতার কারণে প্রায়ই বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়। এর ফলে মানুষআর্থিক ও সামাজিক—উভয় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়; অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানিও ঘটে। প্রতিবছরই কোনো না কোনোসীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রতিবেশী দেশের দিক থেকে অতিরিক্তপানি প্রবেশের ফলে বন্যা দেখা দেয়। এতে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্তহয়, শিশুসহ অনেকে প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে পড়ে এবং বিভিন্নরোগে আক্রান্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে অনেক পরিবার দারিদ্র্যেরচক্রে আটকে যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পর২০২৪ সালেও বৃহত্তর সিলেটসহ আশপাশের জেলাগুলোমারাত্মকভাবে প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব বন্যায় মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, কৃষিজ সম্পদ ও ক্ষুদ্র ব্যবসা হারায়। পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠানক্ষতিগ্রস্ত হয়, করদাতার সংখ্যা কমে যায় এবং অবকাঠামো, শিক্ষা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়। ফলে রাষ্ট্রের ওপরআর্থিক চাপ বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে এবংসামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব পড়ে ব্যক্তি, সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব স্তরের স্থিতিশীলতার ওপর।
বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা টেকসই না হওয়ায়, শুধুপ্রাকৃতিক দুর্যোগই নয়, বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রমও বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকেই নানা অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবৈধভাবে সীমান্তঅতিক্রম করে মানুষের যাতায়াত, গবাদিপশু ও বিভিন্ন পণ্যেরচোরাচালান এবং মাদকের অবৈধ লেনদেন প্রতিনিয়ত ঘটছে। এসব কারণে বাংলাদেশ আর্থিক ও সামাজিক—উভয় দিকথেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা আব্দুল হামিদ খানভাসানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা অভিমুখে একটি ঐতিহাসিক লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটি প্রতিবছর স্মরণ করা হয়। এরমূল উদ্দেশ্য ছিল তিস্তা-সহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিপ্রবাহস্বাভাবিক রাখা, কৃত্রিম বন্যা প্রতিরোধ করা এবং পলিমাটিরস্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা।
উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে দেশের টেকসই উন্নয়ন ও সীমান্তনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব হতে পারে—আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমগ্র সীমান্তজুড়ে একটি টেকসইসীমানা প্রাচীর নির্মাণ এবং এর পাশাপাশি সমান্তরাল খালখননের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। এর ফলেসীমান্ত সুরক্ষা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণেওইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দেশের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা কার্যক্রমকার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশকে একটি শক্তভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব। এতে সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিতহওয়ার পাশাপাশি দেশে নতুন নতুন উদ্যোগের সৃষ্টি হবে এবংঅর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। ফলস্বরূপ, দেশধীরে ধীরে সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়গুলোগুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশের একজনসচেতন নাগরিক হিসেবে বলা যায়, ভারতের সঙ্গে প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটারসীমান্তজুড়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনে একটি টেকসইঅবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরী। অর্থাৎ সীমান্ত এলাকাজুড়েকমপক্ষে ১০ ইঞ্চি পাশ ও ১০ ফুট উচ্চতা দিয়ে একটি“টেকসই সীমানা প্রাচীর” নির্মাণ করতে হবে। যেসব স্থান দিয়েপার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পানি প্রবাহিত হতে পারে, সেই সবযায়গায় প্রাচীরের নিচ দিয়ে নিরাপত্তা বজায় রেখে ছোট ছোটছিদ্র রাখা যেতে পারে যা দিয়ে পানি এসে উক্ত খালে পড়বে।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি নিম্নভূমি অঞ্চল, যেখানেগঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা—এই তিনটি প্রধান নদী ও তাদেরঅসংখ্য শাখা-প্রশাখা মিলিত হয়েছে। উজানের দেশগুলো(ভারত, নেপাল, ভুটান) থেকে অতিরিক্ত পানি নেমে এলে তাবাংলাদেশে জমা হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে মানবসৃষ্ট কারণ কিংবা পাহাড়ি ঢলের ফলে সৃষ্টবন্যায় যে ক্ষতি হয়, প্রস্তাবিত সীমান্ত সুরক্ষা করনীয় কার্যক্রমবাস্তবায়নের মাধ্যমে তা অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। বিশেষকরে অপরিকল্পিত পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তবর্তীএলাকায় কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যার তীব্রতা কমিয়েআনা যেতে পারে।
এছাড়া উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, উজানেরপানিপ্রবাহের সুষ্ট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্রও মেঘনা সহ সংশ্লিষ্ট নদী ব্যবস্থার উন্নয়ন—এসব উদ্যোগগ্রহণের মাধ্যমে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এরফলে অতিরিক্ত পানি সহজে প্রবাহিত হতে পারবে এবং বন্যারঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচি যথাযথভাবেবাস্তবায়িত হলে অতিবৃষ্টিজনিত বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকিআরও কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
প্রাচীর নির্মাণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত উপকরণ ব্যবহার, নির্দিষ্ট দূরত্বপরপর লাইট স্থাপন এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিয়ন্ত্রিতপানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, যাতে প্রাকৃতিকপানিপ্রবাহ ব্যাহত না হয় এবং একই সঙ্গে নিরাপত্তাও বজায়থাকে।
প্রস্তাবিত সীমানা প্রাচীর থেকে প্রায় ১০০ ফুট দূরত্বে কমপক্ষে১৫ ফুট গভীর এবং ১০০ ফুট প্রশস্ত একটি খাল খনন করাযেতে পারে। খালের পাড় যাতে ভেঙ্গে না যায়, সে জন্য তামজবুতভাবে নির্মাণ ও সংরক্ষণ করতে হবে। খালটিবঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা হলেঅতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে, যা বন্যানিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই বৃহৎ কার্যক্রমের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে দেশের সেনাবাহিনী, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনী থেকে ৩৫ বছরের কম বয়সী প্রায়২৫ হাজার সদস্যকে বাছাই করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যনির্মাণকাজে যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি উদ্যমী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের মধ্য থেকে নীতিমালা অনুসরণ করেআরও ২৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
উক্ত দুই শ্রেণির জনবল নির্ধারিত কাজ সফলভাবে সম্পন্নকরতে পারলে তাঁদের পুরস্কার হিসেবে সনদপত্র প্রদান করাযেতে পারে, যা ভবিষ্যতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেসহায়ক হবে। বাহিনীর সদস্যদের জন্য এটি পদোন্নতি বাবেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কাজশুরুর আগে অংশগ্রহণকারীদের ১–২ দিনের প্রাথমিকধারণামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন। এভাবে মোট প্রায়৫০ হাজার জনবল এই প্রকল্পের প্রধান কর্মশক্তি হিসেবে কাজকরবে। প্রয়োজনে প্রতি তিন মাস অন্তর নতুন জনবলঅন্তর্ভুক্ত করে কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যেতে পারে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুমানিক ৩ লক্ষ ৭২ হাজার কোটিটাকা ব্যয় হতে পারে।
সমগ্র সীমান্তজুড়ে প্রতি কিলোমিটারে ৫টি ভূমিহীন পরিবারকেপুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। খালের পাশ থেকেপ্রায় ২০ ফুট ফাঁকা রেখে ৫০ ফুট প্রশস্ত এলাকায় ২৫ বছরেরঅস্থায়ী চুক্তির ভিত্তিতে তাঁদের বসবাসের ব্যবস্থা করা যেতেপারে। এভাবে প্রায় ২২ হাজার পরিবার পুনর্বাসনের সুযোগপাবে।
প্রতি ১০টি পরিবার নিয়ে একটি সমিতি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে ৩ সদস্যের একটি কমিটি থাকবে—একজন সভাপতি, একজন সচিব ও একজন কোষাধ্যক্ষ; বাকিরা সাধারণ সদস্যহিসেবে যুক্ত থাকবে। এই সমিতিগুলোর দায়িত্ব হবে নির্দিষ্টএলাকার (প্রায় ২ কিলোমিটার) সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কেবিজিবিকে তথ্য সরবরাহ করা এবং প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্টব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করেতোলা।
সরকার প্রাথমিকভাবে প্রতিটি পরিবারকে প্রায় ৭ লক্ষ টাকাঋণ সহায়তা দিতে পারে, যা দিয়ে তারা আবাসন নির্মাণেরপাশাপাশি কৃষি, মৎস্যচাষ ও পশুপালন কার্যক্রম শুরু করতেপারবে। এই ঋণ ১০ বছরের মধ্যে মাত্র ৫% সুদে ১২০ কিস্তিতেপরিশোধের সুযোগ রাখা যেতে পারে। ২২ হাজার পরিবারেরএই পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নে আনুমানিক ১৫ হাজারকোটি টাকার একটি সহায়তা তহবিল প্রয়োজন হতে পারে।
পুনর্বাসিত পরিবারগুলো বরাদ্দকৃত জমি ও খালের যথাযথব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করবে। প্রতিটি পরিবার খালসহআনুমানিক ২৫০ ফুট প্রস্থ এবং ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জমিব্যবহার করতে পারবে। তারা খালে মাছ চাষ, হাঁস পালন এবংজমিতে মুরগি, গরু বা ছাগল পালন করতে পারবে। পাশাপাশি ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনেরমাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতেপারবে।
প্রতি ১০ কিলোমিটার অন্তর সীমান্ত এলাকায় ২০ সদস্যবিশিষ্টএকটি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন করা যেতে পারে। ক্যাম্পেরদায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০টি সমিতিরপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকের মাধ্যমেসমিতিগুলোর কার্যক্রম, অগ্রগতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তাসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। পুরো কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে থাকবে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড, যারা সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে।
সরকার চাইলে ধাপে ধাপে ১০ বছরের মধ্যে এই সীমান্ত সুরক্ষাকার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারে। এতে দেশের নাগরিকরাস্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবে এবং সীমান্ত রক্ষায় সহযোগীশক্তিতে পরিণত হবে। অবৈধ যাতায়াত হ্রাস পাবে, চোরাচালান ও ক্ষতিকর পণ্যের প্রবেশ কমবে এবংনাগরিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। অর্থনৈতিককর্মকাণ্ড বাড়বে, মানুষ আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে এবংবন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ঝুঁকি কমবে।
সর্বোপরি, একটি সুপরিকল্পিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেসবার আগে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবংপ্রায় ২২ হাজার ভূমিহীন পরিবারের জীবন-জীবিকা টেকসইভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একটিনিরাপদ, দারিদ্র্যমুক্ত ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে আরওদৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
সামগ্রিকভাবে, ইহার ফলে সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত সীমান্তব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা শুধু ২২,০০০ ভূমিহীন পরিবারের জন্যইনয়, বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্যও টেকসই জীবিকা নিশ্চিতকরার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে একযুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারকরা, সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকঅর্থনৈতিক সুযোগ প্রসারের মাধ্যমে এ ধরনের একটি উদ্যোগদীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতায় অবদানরাখতে পারবে। এভাবে বাংলাদেশ আরও বেশিআত্মবিশ্বাসের সাথে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল, দারিদ্র্যমুক্তও মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে।











