ঢাকা , শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উচ্চ খেলাপি ঋণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

সাংবাদিক

দেশের ব্যাংক খাতে তিন ভাগের এক ভাগ ঋণ এখন খেলাপি। পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি। উচ্চমাত্রার এই খেলাপি ঋণ কেবল ব্যাংক খাত নয়; ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খেলাপি ঋণের কারণে কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের ঠিকমতো টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তারা ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। খেলাপি ঋণের কারণে এলসি খোলার খরচ বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যে এবং শেষ পর্যন্ত তা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে।

একাধিক ব্যাংকার জানিয়েছেন, সার্বিকভাবে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ পরিস্থিতি বেশ দুর্বল। গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। সুদ বাদে হিসাব করলে প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ঋণাত্মক।

এর পেছনেও উচ্চ খেলাপি ঋণ অন্যতম কারণ বলে জানান ব্যাংকাররা। তারা বলেন, ভালো ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমে গেছে। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেকে ঋণ নিতে চাইলেও অনেক ব্যাংক তাতে সাড়া দিচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে অনাদায়ী তবে খেলাপি দেখানো হচ্ছে না– এ রকম ঋণ রয়েছে আরও প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা। গত বছর শেষে এ ধরনের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়। মোট ঋণের যা ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

২০২৪ সাল শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ছিল সাত লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এর মানে, এক বছরে এ ধরনের ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের আদায় অনিশ্চিত উচ্চ ঝুঁকির ঋণকে দুর্দশাগ্রস্ত তথা ডিসট্রেস অ্যাসেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বলতে খেলাপি ঋণ, পুনঃতপশিল করা ঋণের অনাদায়ী অংশ এবং অবলোপন করে আলাদা করে রাখা অনাদায়ী ঋণকে বোঝানো হয়। এখনকার খেলাপি ঋণের বড় অংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সৃষ্ট

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, খেলাপি ঋণের প্রভাব এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ঋণগ্রহীতারা ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিলে ব্যাংকের অর্থপ্রবাহে সমস্যা হয়। আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পেতে সমস্যায় পড়ছেন এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো আস্থা বা বিশ্বাস। সেই আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে ভালো প্রতিষ্ঠানও ব্যবসা করতে পারবে না। যদি নিয়ন্ত্রকের ওপর মানুষের আস্থা না থাকে, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা না থাকে এবং আইন ও নিয়মকানুনের ওপরেও আস্থা উঠে যায়, তাহলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখার আগ্রহও হারিয়ে ফেলবে। স্বর্ণ কেনা বা জমির মতো সম্পদে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণগ্রহীতাদের একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত সুফল আসেনি। ফলে এ জায়গায় নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে না পারলে ব্যাংকের আয় কমে যাবে; তারল্য সংকট তৈরি হবে এবং ব্যাংকগুলো সময়মতো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন ঘাটতি থেকে মূলধন ঘাটতিতে পড়ে ব্যাংকের রেটিংয়ে প্রভাব পড়ে। কোনো ব্যাংকের রেটিং খারাপ হলে এলসি খোলায় বাড়তি ব্যয় করতে হয়। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতপশিল সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাস্তবতা বুঝতে হবে। বড় কিছু গ্রাহক গত ১৫ থেকে ১৭ বছর বৈরী পরিবেশের কারণে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি। ঋণ পরিশোধে তারা সমস্যায় পড়েছেন। কারও কারও ঋণের পরিমাণ বেড়ে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এসব বিবেচনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ০৫:৫৭:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫০৩ Time View

উচ্চ খেলাপি ঋণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে

আপডেটের সময় : ০৫:৫৭:৪৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের ব্যাংক খাতে তিন ভাগের এক ভাগ ঋণ এখন খেলাপি। পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি। উচ্চমাত্রার এই খেলাপি ঋণ কেবল ব্যাংক খাত নয়; ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খেলাপি ঋণের কারণে কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের ঠিকমতো টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তারা ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। খেলাপি ঋণের কারণে এলসি খোলার খরচ বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যে এবং শেষ পর্যন্ত তা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে।

একাধিক ব্যাংকার জানিয়েছেন, সার্বিকভাবে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ পরিস্থিতি বেশ দুর্বল। গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। সুদ বাদে হিসাব করলে প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি এখন ঋণাত্মক।

এর পেছনেও উচ্চ খেলাপি ঋণ অন্যতম কারণ বলে জানান ব্যাংকাররা। তারা বলেন, ভালো ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমে গেছে। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেকে ঋণ নিতে চাইলেও অনেক ব্যাংক তাতে সাড়া দিচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে অনাদায়ী তবে খেলাপি দেখানো হচ্ছে না– এ রকম ঋণ রয়েছে আরও প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা। গত বছর শেষে এ ধরনের দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়। মোট ঋণের যা ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

২০২৪ সাল শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ছিল সাত লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এর মানে, এক বছরে এ ধরনের ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৩১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের আদায় অনিশ্চিত উচ্চ ঝুঁকির ঋণকে দুর্দশাগ্রস্ত তথা ডিসট্রেস অ্যাসেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বলতে খেলাপি ঋণ, পুনঃতপশিল করা ঋণের অনাদায়ী অংশ এবং অবলোপন করে আলাদা করে রাখা অনাদায়ী ঋণকে বোঝানো হয়। এখনকার খেলাপি ঋণের বড় অংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সৃষ্ট

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, খেলাপি ঋণের প্রভাব এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। ঋণগ্রহীতারা ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দিলে ব্যাংকের অর্থপ্রবাহে সমস্যা হয়। আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পেতে সমস্যায় পড়ছেন এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো আস্থা বা বিশ্বাস। সেই আস্থা নষ্ট হয়ে গেলে ভালো প্রতিষ্ঠানও ব্যবসা করতে পারবে না। যদি নিয়ন্ত্রকের ওপর মানুষের আস্থা না থাকে, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা না থাকে এবং আইন ও নিয়মকানুনের ওপরেও আস্থা উঠে যায়, তাহলে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখার আগ্রহও হারিয়ে ফেলবে। স্বর্ণ কেনা বা জমির মতো সম্পদে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারে। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণগ্রহীতাদের একের পর এক বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত সুফল আসেনি। ফলে এ জায়গায় নতুন করে ভাবার সুযোগ আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে না পারলে ব্যাংকের আয় কমে যাবে; তারল্য সংকট তৈরি হবে এবং ব্যাংকগুলো সময়মতো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারবে না। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে প্রভিশন ঘাটতি থেকে মূলধন ঘাটতিতে পড়ে ব্যাংকের রেটিংয়ে প্রভাব পড়ে। কোনো ব্যাংকের রেটিং খারাপ হলে এলসি খোলায় বাড়তি ব্যয় করতে হয়। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতপশিল সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাস্তবতা বুঝতে হবে। বড় কিছু গ্রাহক গত ১৫ থেকে ১৭ বছর বৈরী পরিবেশের কারণে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি। ঋণ পরিশোধে তারা সমস্যায় পড়েছেন। কারও কারও ঋণের পরিমাণ বেড়ে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এসব বিবেচনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।