ঢাকা , সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিতে সমন্বিত উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর এনআইডি পেলেন ৫৪ হাজার ৪৭৭ জন প্রবাসী র‍্যাবের সক্ষমতা বাড়াতে কেনা হচ্ছে আরও ১৬৭টি গাড়ি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা বাণী নিলামে কেনা সম্পত্তির ওপর ভ্যাট দিতে হবে না: হাইকোর্ট আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১৯তম কারামুক্তি দিবস নাম বদলে যাচ্ছে র‍্যাবের, সংসদে বিল ৪১ ব্যাংকের সিএসআরের ২৭৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে হাসিনা-রেহানাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা এনআইডিসহ সকল পরিচয়পত্রের পরিবর্তে আসছে ‘এক-আইডি’

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস

সাংবাদিক

বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের আপত্তির মধ্যেই মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দিতে তিনটি বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন।

দুই কার্যদিবসে কমিটির প্রতিবেদন

গত ২৭ আগস্ট বিল তিনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিলগুলো সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন।

পরবর্তী সময়ে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের বিভিন্ন ধারায় সংশোধনের সুপারিশ করে। আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলটিও সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটেও বিলগুলো পাস হলো। সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় মানবাধিকার, গণভোট ও গুমসহ বিভিন্ন বিষয়ে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশের আইনগত কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।

গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য নয়—এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে গুম প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে—কোনও সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারি কর্তৃপক্ষ বা শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কাউকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনওভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর তা অস্বীকার করলে অথবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন করলে এবং এর মাধ্যমে তাকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।

নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে। অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা তদন্তের অগ্রগতি জানার, ঘটনার সত্য উদঘাটনের এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার পাবেন।

এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র সেই ব্যয় বহন করবে।

গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা তাদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের ঘটনাগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার—উভয়ই সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে।

তবে গুমের ঘটনা তদন্তে কোনও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের বিধান রাখা হয়নি। তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই থাকছে।

রুমিন ফারহানার প্রস্তাব

রুমিন ফারহানা গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গোপন বন্দিশালা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেন। তবে তাড়াহুড়া করে বিলটি পাস না করে আরও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান তিনি।

বিলটি সংশোধনের জন্য তিনি পাঁচটি প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে গুমকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে চলমান বা অবিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা, কোনও নাগরিককে সর্বশেষ কোন বাহিনীর হেফাজতে দেখা গেছে তা প্রমাণের প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর দেওয়া এবং সামরিক ও বেসামরিক বিচারিক দ্বন্দ্ব এড়াতে বিলে সুস্পষ্ট নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া কাউকে আটকের সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং অভিযোগের ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে অনুপস্থিতির সনদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব দেন তিনি।

রুমিন ফারহানা বলেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের আইন দায়সারা বা তাড়াহুড়া করে পাস না করে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ বিলটি আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

নতুন কাঠামোতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন।

নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে।

কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও তদন্ত চলাকালে আরও ক্ষতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।

বিলে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলের (অপশনাল প্রটোকল) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যাশনাল প্রিভেনটিভ মেকানিজম ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই ইউনিট নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে কাজ করবে।

আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিলটি পর্যালোচনা করে কমিশনে চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনার রাখার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিককে নিয়োগ-সুপারিশকারী সার্চ কমিটিতে রাখার সুপারিশ করা হয়। ওই সাংবাদিককে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনোনীত করবেন।

সম্পত্তিতে আজীবন ভোগস্বত্ব

সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ সংশোধন করে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনগত অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।

এ জন্য আইনে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে এই বিধান সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

সরকার বলেছে, নতুন ব্যবস্থা প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা বা সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্য কোনও স্বীকৃত পদ্ধতিতে কোনও প্রভাব ফেলবে না এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে না।

বিরোধীদের আপত্তি

বিল তিনটি পাসের আগে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা বিশেষ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে পরবর্তী আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিরোধী দলের সদস্যরা অংশ নেননি।

তিনি অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগী, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিল করা হয়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, অধ্যাদেশ বাতিলের পর সরকার শক্তিশালী আইন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রস্তাবিত বিলটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও সংকীর্ণ হয়েছে। এতে প্যারিস নীতিমালা, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনের মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক দলিল যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

কমিটিকে বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এত কম সময়ে অর্থবহ পরামর্শ ও স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। এতে সংসদীয় কমিটি ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তবে সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি বিল দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সংশোধনীসহ পাসের সুপারিশ করেছে।

বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এই আইনটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী। সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে কোরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনও আইন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই বিল পাস করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামও বলেছেন, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে দানের এই বিধান ইসলামী আইনের পরিপন্থি। এতে আল্লাহর দেওয়া মিরাসি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর যুক্তি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষায় ২০১৩ সালের আইন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিলের মাধ্যমে উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হলে এর পক্ষে ভোটদানকারীদের দায়ভার নিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল এই বিল পাসের প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে।

এর আগে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, বয়স্ক বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কমানোর উদ্দেশ্যের বিরোধিতা তারা করছেন না। কিন্তু ইসলামের স্বীকৃত হেবা ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও আইন মেনে নেওয়া যায় না।

হেবা শুধু রেজিস্ট্রেশন করলেই সম্পূর্ণ হয় কিনা, বাস্তব দখল ও নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরিত হতে হবে কিনা—এসব বিষয়ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। জীবনভর দাতার ভোগদখলের অধিকার থাকলে এটি হেবা নাকি মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের ব্যবস্থা—সে প্রশ্ন থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে ভিন্নমত রুমিন ফারহানার

‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিষয়ে আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু সংশোধনের কথা বলেন তিনি

রুমিন ফারহানা বলেন, বাবা-মাকে সন্তানদের নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল থেকে রক্ষায় বিলটি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

তবে সন্তান বাবা-মাকে অবহেলা বা নির্যাতন করলে দান বাতিলের সুযোগ রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন রুমিন। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাতাকে পারিবারিক আদালতে রেজিস্ট্রি দলিল বাতিলের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

দাতার লিখিত সম্মতি ছাড়া ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখারও দাবি জানান তিনি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপডেটের সময় : ০৪:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫২২ Time View

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল পাস

আপডেটের সময় : ০৪:২৯:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের আপত্তির মধ্যেই মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দিতে তিনটি বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ।

রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন।

দুই কার্যদিবসে কমিটির প্রতিবেদন

গত ২৭ আগস্ট বিল তিনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বিলগুলো সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন।

পরবর্তী সময়ে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের বিভিন্ন ধারায় সংশোধনের সুপারিশ করে। আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলটিও সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটেও বিলগুলো পাস হলো। সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় মানবাধিকার, গণভোট ও গুমসহ বিভিন্ন বিষয়ে জারি করা ২০টি অধ্যাদেশের আইনগত কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।

গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য নয়—এমন ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে গুম প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা এবং ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি মারা গেলে অথবা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে—কোনও সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারি কর্তৃপক্ষ বা শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কাউকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্য কোনওভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর তা অস্বীকার করলে অথবা ওই ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন করলে এবং এর মাধ্যমে তাকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।

নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে আদালত তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবে। অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, হুইসেলব্লোয়ার ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা তদন্তের অগ্রগতি জানার, ঘটনার সত্য উদঘাটনের এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার পাবেন।

এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পদ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা হবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্র সেই ব্যয় বহন করবে।

গুম হওয়া ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী এবং নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা তাদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির সুবিধার্থে নিখোঁজ সনদ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

বিলে গুমের ঘটনাগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তদন্ত ও বিচার—উভয়ই সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে।

তবে গুমের ঘটনা তদন্তে কোনও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের বিধান রাখা হয়নি। তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই থাকছে।

রুমিন ফারহানার প্রস্তাব

রুমিন ফারহানা গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গোপন বন্দিশালা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেন। তবে তাড়াহুড়া করে বিলটি পাস না করে আরও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান তিনি।

বিলটি সংশোধনের জন্য তিনি পাঁচটি প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে গুমকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে চলমান বা অবিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা, কোনও নাগরিককে সর্বশেষ কোন বাহিনীর হেফাজতে দেখা গেছে তা প্রমাণের প্রাথমিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর দেওয়া এবং সামরিক ও বেসামরিক বিচারিক দ্বন্দ্ব এড়াতে বিলে সুস্পষ্ট নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া কাউকে আটকের সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং অভিযোগের ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে অনুপস্থিতির সনদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব দেন তিনি।

রুমিন ফারহানা বলেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের আইন দায়সারা বা তাড়াহুড়া করে পাস না করে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ বিলটি আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

নতুন কাঠামোতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন।

নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে।

কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও তদন্ত চলাকালে আরও ক্ষতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।

বিলে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকলের (অপশনাল প্রটোকল) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যাশনাল প্রিভেনটিভ মেকানিজম ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই ইউনিট নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে কাজ করবে।

আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিলটি পর্যালোচনা করে কমিশনে চেয়ারম্যানসহ চার কমিশনার রাখার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিককে নিয়োগ-সুপারিশকারী সার্চ কমিটিতে রাখার সুপারিশ করা হয়। ওই সাংবাদিককে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনোনীত করবেন।

সম্পত্তিতে আজীবন ভোগস্বত্ব

সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ সংশোধন করে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি বা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার আইনগত অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।

এ জন্য আইনে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে এই বিধান সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

সরকার বলেছে, নতুন ব্যবস্থা প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের হেবা বা সম্পত্তি হস্তান্তরের অন্য কোনও স্বীকৃত পদ্ধতিতে কোনও প্রভাব ফেলবে না এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে না।

বিরোধীদের আপত্তি

বিল তিনটি পাসের আগে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা বিশেষ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ বিল নিয়ে পরবর্তী আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিরোধী দলের সদস্যরা অংশ নেননি।

তিনি অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগী, সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিল করা হয়েছে।

নাজিবুর রহমান বলেন, অধ্যাদেশ বাতিলের পর সরকার শক্তিশালী আইন করার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রস্তাবিত বিলটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও সংকীর্ণ হয়েছে। এতে প্যারিস নীতিমালা, গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনের মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক দলিল যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

কমিটিকে বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাত্র দুই কার্যদিবস সময় দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এত কম সময়ে অর্থবহ পরামর্শ ও স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। এতে সংসদীয় কমিটি ‘রাবার স্ট্যাম্পে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তবে সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি বিল দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সংশোধনীসহ পাসের সুপারিশ করেছে।

বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এই আইনটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী। সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে কোরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনও আইন না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই বিল পাস করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামও বলেছেন, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে দানের এই বিধান ইসলামী আইনের পরিপন্থি। এতে আল্লাহর দেওয়া মিরাসি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইসলামী পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর যুক্তি নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষায় ২০১৩ সালের আইন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিলের মাধ্যমে উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হলে এর পক্ষে ভোটদানকারীদের দায়ভার নিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল এই বিল পাসের প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে।

এর আগে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, বয়স্ক বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কমানোর উদ্দেশ্যের বিরোধিতা তারা করছেন না। কিন্তু ইসলামের স্বীকৃত হেবা ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও আইন মেনে নেওয়া যায় না।

হেবা শুধু রেজিস্ট্রেশন করলেই সম্পূর্ণ হয় কিনা, বাস্তব দখল ও নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরিত হতে হবে কিনা—এসব বিষয়ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। জীবনভর দাতার ভোগদখলের অধিকার থাকলে এটি হেবা নাকি মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের ব্যবস্থা—সে প্রশ্ন থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে ভিন্নমত রুমিন ফারহানার

‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর বিষয়ে আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। পাশাপাশি সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু সংশোধনের কথা বলেন তিনি

রুমিন ফারহানা বলেন, বাবা-মাকে সন্তানদের নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল থেকে রক্ষায় বিলটি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

তবে সন্তান বাবা-মাকে অবহেলা বা নির্যাতন করলে দান বাতিলের সুযোগ রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন রুমিন। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাতাকে পারিবারিক আদালতে রেজিস্ট্রি দলিল বাতিলের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

দাতার লিখিত সম্মতি ছাড়া ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখারও দাবি জানান তিনি।